আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৫ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- রাত ৪:৪৯

আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৫ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আল্লাহর পথে ত্যাগ ও কুরবানী

হাদিসের অর্থ :
খাব্বাব ইব্‌নু আরাত রা. থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে কোন বিষয়ে অভিযোগ পেশ করলাম। তখন তিনি কাবা ঘরের ছায়ায় তাঁর চাদরকে বালিশ বানিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমরা বললাম, (আমাদের জন্য কি) সাহায্য চাইবেন না? আমাদের জন্য কি দু‘আ করবেন না? তিনি বললেন, তোমাদের আগের লোকদের মাঝে এমন ব্যক্তিও ছিল, যাকে ধরে নিয়ে তার জন্য যমীনে গর্ত করা হত। তারপর করাত এনে মাথায় আঘাত হেনে দু’টুকরা করে ফেলা হত। লোহার শলাকা দিয়ে তার গোশত ও হাড্ডি খসানো হত। তা সত্বেও তাকে তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না। আল্লাহ্‌র কসম! এ দ্বীন অবশ্যই পূর্ণতা লাভ করবে। এমন হবে যে সান‘আ থেকে হাযারামাওত পর্যন্ত ভ্রমণকারী ভ্রমণ করবে। অথচ সে আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না এবং নিজের মেষ পালের জন্য বাঘের ভয় থাকবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়ো করছ।
(সহীহুল বুখারী- ৬৯৪৩, ৩৬১২, ৩৮৫২, আবু দাউদ-২৬৪৩) (www.iscabd.org)

রাবী পরিচিতি
খাব্বাব ইবনুল আরাতের মূলনাম খাব্বাব এবং উপনাম/কুনিয়াত আবু আবদিল্লাহ। তাঁর পিতার নাম আরাত। তাঁর বংশ সম্পর্কে মতভেদ আছে। তিনি বনু তামীম গোত্রের সন্তান। তবে কোন ইতিহাসবিদ বনু খুযায়া গোত্রের সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন। খাব্বাব সৌদি আরবের নজদে জন্মগ্রহণ করেন।
বনু তামীম গোত্র পূর্বে স্বাধীন গোত্রই ছিলো।তবে মক্কার অন্য গোত্র তাদের আক্রমণ করে বন্ধী অবস্থায় বিক্রি করে দিলে তারা দাসে পরিনত হয়। এর মধ্যে খাব্বাব ইবনুল আরাত একজন। (www.iscalibrary.com)

রাসুলুল্লাহর (সা.) সাহাবীদের মধ্যে যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, যাঁরা কাফিরদের নির্যাতনের অগ্নিপরীক্ষায় নিজেদের পেশ করেছেন, হযরত খাব্বাব রা. তাঁদের অন্যতম। পাঁচ-ছয় জন লোক মুসলমান হওয়ার পরেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সেজন্য সুদীর্ঘ সময় তাকে কাফিরদের নির্যাতন ভোগ করতে হয়।

লৌহবর্ম পরিয়ে তাকে রোদে ফেলে রাখা হত; ফলে তার শরীর থেকে ঘাম বের হতে থাকতো। অধিকাংশ সময় তাকে নগ্ন দেহে তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে রাখা হত। যার ফলে প্রচন্ড তাপে তার কোমরের মাংস গলে পড়ে যেতো।

তিনি এক কাফের স্ত্রীলোকের ক্রীতদাস ছিলেন। তার মনিব যখন জানতে পারলো যে, তিনি নবী করীম সা. এর নিকট আসা-যাওয়া করেন, তখন ঐ নারী লোহা গরম করে তার মাথায় দাগ দিতো। (www.facebook.com/iscabd91)

হযরত ওমর রা. তার কাছ থেকে নির্যাতন ভোগের বিস্তারিত বিবরণ জানতে চান। তখন হযরত খাব্বাব রা. বলেন, “আমার কোমর দেখুন!” হযরত ওমর রা. তার কোমর দেখে বলেন, এমন কোমর তো আমি কোথাও দেখি নাই। তখন হযরত খাব্বাব রা. বললেন, আমাকে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর রেখে চেপে ধরতো ফলে আমার চর্বি এবং রক্ত গলে আগুন নিভে যেত।

এমন নির্মম শাস্তি ভোগ করা সত্ত্বেও ইসলামের যখন শক্তি বৃদ্ধি হলো এবং মুসলমানদের বিজয় আসতে লাগলো তখন তিনি উচ্চ কণ্ঠে কেঁদে কেঁদে বলতেন, আল্লাহ না করুন! আমার কষ্টের পুরস্কার দুনিয়াতেই যেন লাভ না হয়ে যায়।

৩৭ হিজরিতে তিনি কুফায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। বিভিন্ন চিকিৎসা সত্বেও রোগ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে ও দীর্ঘদিন রোগ যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকেন তিনি। অবশেষে ৩৯ হিজরিতে সিফফীন যুদ্ধের পর ৭২ বছর বয়সে কুফায় ইনতিকাল করেন। খলিফা আলী রা. তার নামাযে জানাযার ইমামতি করেন এবং তার ইচ্ছা অনুসারে কুফা শহরের বাইরে তাকে কবর দেওয়া হয়।

গ্রন্থ পরিচিতি
সহীহ আল-বুখারী ( আরবি : ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ) একটি প্রসিদ্ধ হাদীস গ্রন্থ। এর আসল ও পুরো নাম, ﺍﻟﺠﺎﻣﻊ ﺍﻟﻤﺴﻨﺪ ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ ﺍﻟﻤﺨﺘﺼﺮ ﻣﻦ ﺃﻣﻮﺭ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠّٰﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠّٰﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭﺳﻨﻨﻪ ﻭﺃﻳﺎﻣﻪ
এটি কুতুবুস সিত্তাহ অর্থাৎ হাদীসের প্রধান ছয়টি গ্রন্থের অন্তর্গত একটি গ্রন্থ। (www.twitter.com/iscabd91)

শানে উরুদ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাফিরতের অমানবিক অত্যাচারের পরও কোনো কাফেরের বিরুদ্ধে বদ দোয়া করছিরেন না, তখন এই সাহাবী কোরআনের আয়াত { ادعوني أستجب لكم } { فلولا إذ جاءهم بأسنا تضرعوا } দু’টি পাঠ করলে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে এই হাদীসটি বলেন। (ফাতহুল বারী)

হাদীসের ব্যাখ্যা :
সবচেয়ে বেশি বিপদ-মুসিবত তথা পরিক্ষা-নিরিক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন আম্বিয়ায়ে কেরামগণ। এরপর তাদের অনুসরণের ক্ষেত্রে যারা যত বেশি অগ্রসর তাদের কে তত বেশি বিপদ বা পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। খাব্বাব রা. এর জিবনী থেকে বুঝা যায় তিনি কতটা নির্যাতিত হয়েছেন, তারপরও তিনি যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বললেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্তনা দিয়ে পূর্বের উম্মতের উপর আরো কঠিন নির্যাতনের বর্ণনা করেন।

শিক্ষা
১. দ্বীনের জন্য সর্বোচ্চ টুকু কোরবানির মানসিকতা রাখা।
২. দ্বীনি কাজে ধর্য্য ধারন করা
৩. দ্বীনি কাজে যত বড় পরীক্ষা বা নির্যাতন আসুক হতাশ হওয়া যাবেনা।

তথ্যসূত্র
সহীহুল বুখারী
ফাতহুল বারী
(হায়াতুস সাহাবা-১/২৯২,
মুসতাদরাক,
সীরাতু ইবন হিশাম, টীকা-১/৩৪৩)

লেখক : মোঃ মোফাচ্ছেল খান, মুবাল্লিগপ্রত্যাশী, প্রশিক্ষণ সম্পাদক, ইশা ছাত্র আন্দোলন, লক্ষ্মীপুর

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন