আজ ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং রবিবার | ৯ই সফর, ১৪৪২ হিজরী | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- সকাল ৬:৩৪

আজ ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং রবিবার | ৯ই সফর, ১৪৪২ হিজরী | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

আল-কুরআন ও বিজ্ঞান

আল-কুরআন আসমানী কিতাব। আবতীর্ণ হয়েছে গোটা মানব জাতির দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য। বিজ্ঞান হলো সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে যে গুণাবলী রেখেছেন তা খুজে বের করে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো। আখিরাত যেহেতু আমাদের দৃষ্টির বাইরে তাই আখিরাতের বিষয়গুলি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশি গবেষণা করেননা। আর প্রকৃতপক্ষে দুনিয়ার জীবনের চেয়ে যেহেতু আখেরাতের জীবন সহ¯্র কোটি বেশি মূল্যবান তাই আল-কুরআনে আখিরাতের জীবনের বেশি আলোচনা করা হয়েছে। তবে পৃথিবীতে যত প্রকারের জ্ঞান-বিজ্ঞান আবিস্কার হয়েছে সকল জ্ঞানের মূল উৎস হলো আল-কুরআন এবং বিজ্ঞাননের প্রায় সকল শাখাই মুসলমানদের হাত ধরেই সূচিত হয়েছে। আজ আমরা ইসলাম থেকে দূরে থাকার কারণে জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকেও দূরে। এখনও যদি আমরা আল-কুরআন অনুযায়ী আমাদের জীবনকে সাজাই এবং কুরআন নিয়ে গবেষণা করি তবে সকল বিজ্ঞান আমাদের হাতের নাগালে চলে আসবে ইনশাআল্লাহ।
আল কুরআনের সূরা ইয়াসিনের দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন প্রজ্ঞাময় কুরআনের শপথ। কুরআন যে প্রজ্ঞাময় (বিজ্ঞানময়) একটি গ্রন্থ তা বোঝার জন্য কুরআনের দুটি আয়াত ও তার সঙ্গে বিজ্ঞানের তুলনামূলক আলোচনা করলে তা সহযে বোঝা যাবে। আল-কুরআনের একটি সূরা আছে, যার নাম সূরা নাহল বা মৌমাছির সূরা। এ সূরার কয়েকটি আয়াতে মৌমাছি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। আল্লার কুরআনের মহত্ব বোঝার জন্য শুধু বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটি উক্তি তুলে ধরতে চাই। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছেন পৃথিবী থেকে যদি মৌমাছি কে বিলুপ্ত করে দেয়া হয়, অর্থ্যাৎ কোন কারণে যদি পৃথিবীতে মৌমাছি না থাকে তবে পৃথিবী মাত্র চার বছর টেকবে। তারপর পৃথিবী ঠিকে থাকতে পারবেনা। কারণ মৌমাছি ফুলে-ফুলে বিচরণ করে পরাগায়ন ঘটায়। পরাগায়ন না হলে কোন উদ্ভিদ জন্মাবে না। আর উদ্ভিদ না জন্মালে পৃথিবীতে কোন প্রাণি বেঁচে থাকতে পারবেনা।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, “আর তোমার প্রতিপালক মৌমাছিদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা পাহাড়-পর্বত, গাছপাালা এবং মানুষের বাড়িতে নিজেদের বাসা তৈরি করো। অতপর বিভিন্ন ধরণের ফুল-ফল থেকে খাবার সংগ্রহ করো এবং তোমার প্রতিপালকের প্রদর্শিত পথে চল।” এ পতঙ্গের পেট থেকে এক প্রকার পানীয় বের হয় যাতে মানব জাতির জন্য রোগের প্রতিষেধক রয়েছে। নিশ্চয় এর মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্য রয়েছে নিদর্শন। (আল-কুরআন, সূরা নাহল, আয়াত ৬৮-৬৯)।
পৃথিবীর যত জায়গায় মৌমাছি পাওয়া যায়, কোন জায়গাতেই মৌমাছি এ তিন স্থান অর্থ্যাৎ পাহাড়, গাছপালা ও মানুষের ঘরবাড়ি এর বাইরে কোথাও চাক বা বাসা তৈরি করেনা। তারপর আল্লাহ তা’য়ালা মৌমাছিকে বলেছেন তোমরা বিভিন্ন ফুল-ফল থেকে খাবার সংগ্রহ কর। মৌমাছি যেমন পতঙ্গ তেলাপোকাও তেমনি একটা পতঙ্গ। তেলাপোকা সকল ধরণের খাদ্য গ্রহণ করে কিন্তু মৌমাছি শুধু ফুল থেকে পরাগ ও ফুলের রস বা নেকটার খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এছাড়া মৌমাছি অন্য কোন খাদ্য গ্রহণ করেনা। তারপর আল্লাহ তা’য়ালা মৌমাছিদের সম্পর্কে যে কথাটি বললেন তা হলো, তোমার প্রতিপালকের নির্দেশিত পথে চল। মৌমাছির মধ্যে সৃষ্টিকর্তা শৃক্সখলা অনুযায়ী চলার জন্য রাণী মৌমাছির মধ্যে আল্লাহ তায়ালা এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ দান করেছেন যাকে অ·ি-ডেকানোইক এসিড (ড়ীু-ফবপধহড়রপ ধপরফ) বলে। যা রাণী মৌমাছির ম্যান্ডিবুলার গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয় একে রাণীগন্ধও বলা হয়। এ গন্ধের দ্বারা আকৃষ্ট মৌচাকের অন্য সকল মৌমাছি রাণীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। একটি মৌচাকে মৌমাছির প্রজাতিভেদে ২০ হাজার থেকে ৮০ হাজার পর্যন্ত মৌমাছি থাকতে পারে। এর মধ্যে রানী মৌমাছি থাকে মাত্র একটি। পুরুষ মৌমাছি থাকে ২০০-৬০০। এ ছাড়া বাকিরা সব কর্মী মৌমাছি। রাণী মৌমাছির মধ্যে রাণীগন্ধ থাকার কারণে সকল শ্রমিক ও পুরুষ মৌমাছি রানীর আনুগত্য করে। এমনকি একসাথে একহাজার মৌচাক থাকলেও শ্রমিক মৌমাছি তার রানীগন্ধের কারণে তার নির্দিষ্ট মৌচাকে ফিরে আসে। শ্রমিক মৌমাছি তার বাসা ছেড়ে অন্য কোন বাসায় যায়না। শ্রমিক মৌমাছিদেরকে আল্লাহ তা’য়ালা চলার একটি পথ দেখিয়েছেন। তা হলো সূর্য। শ্রমিক মৌমাছি যখন খাবারের খোঁজে কোথাও দূরে চলে যায়, তখন সে সূর্যকে তার দিক নির্দেশনার বস্তু বানায়। এমনকি দূরে কোন স্থানে যদি মধুর সন্ধান পায় তবে সে অন্য মৌমাছিকে জানায় একটি নাচের মাধ্যমে। যাকে টেইল ওয়াগিং ডেন্স বলে। এ ডেন্স বা নাচের মাধ্যমে মৌমাছি তার সহকর্মীকে জানিয়ে দেয় মধুর উৎসটি তাদের বাসা থেকে কত দূরে। মধু কি কম না বেশি। নতুন মধুর স্থানটি তাদের মৌচাক থেকে কোন দিকে তা বোঝানোর জন্য মৌমাছিরা সূর্যকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে।
আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, এ পতঙ্গের পেট থেকে এক প্রকার পানীয় বের হয় যা বিভিন্ন রঙের হতে পারে এবং এ পানীয়তে মানুষের জন্য রোগের প্রতিষেধক রয়েছে। মৌমাছির পেটের মধ্যে তার খাদ্যথলির বাইরেও আরেকটি থলি আছে, যাকে বলে ঐড়হবু ংঃড়সধপয। এ হানি স্টোমাকে বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক পদার্থ আছে। মৌমাছিরা যখন ফুলে ফুলে বিচরণ করে তখন ফুল থেকে নেকটার (এক প্রকার মিষ্টিরস) সংগ্রহ করে তাদের মধু থলি বা হানি স্টোমাকে জমা রাখে। হানি স্টোমাকের বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক পদার্থের সঙ্গে এ মিষ্টি রসের বিভিন্ন ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় মধু তৈরি হয়। এ মধু মৌমাছিরা তাদের বাচ্চাদের খাবারের জন্য এবং খাদ্য সংকটে খাওয়ার জন্য মৌচাকে জমা রাখে।
আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনে বিভিন্ন রঙের পানীয় বলেছেন এ মধু কে। কারণ মধু একটি তরল পদার্থ। যা মানুষ পান করে। মধুতে যে ফুলের রস বেশি থাকে মধুর রং সে ফুলের মতই হয় তাই কুরআনে বিভিন্ন রঙের কথা বলা হয়েছে। যেমন সরিষা ফুলের মধু এক রঙের আবার লিচু ফুলের মধু আরেক রঙের ।কুরআনে আল্লাহ তায়ারা মধুকে মানুষের জন্য রোগ প্রতিষেধক বলেছেন। বিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে মধুতে নি¤œ লিাখত রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে ।
ফ্রুক্টোজ ৩৮.১৯%
গ্লুকোজ ৩১.২৮%
মালটোজ ও অন্যান্য ৮.৮১%
সাধারণ চিনি ১.৩১%
এসিড ০.৫৭%
প্রোটিন ০.২৬%
খনিজসমূহ ০.১৭%
এনজাইম ভিটামিন ও অন্যান্য ২.২১%
প্রাকৃতিক ময়েশ্চার ১৭.২০%
১০০.০০%

বিভিন্ন গবেষণায় প্রমানীত হয়েছে যে, মধু শর্করা জাতীয় তাৎক্ষণিক শক্তি যোগানো খাদ্য। যা বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন, এনজাইম ও খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ। মধুর গ্লুকোজ সরাসরি রক্ত দিয়ে শোষিত হয়ে দেহে শক্তি যোগায়। এর জন্য কোন বিপাক ক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। মধুর আমিষ আমাদের দৈহিক বৃদ্ধি ও ক্ষয় পূরণের পক্ষে সহায়ক। মধুতে বিদ্যমান খনিজ লবণ শরীরকে সুস্থ ও সজীব রাখে এবং দেহের আভ্যন্তরীণ শরীরবৃত্তীয় কার্যাবলি নিয়ন্ত্রয়ণে সহায়তা করে। মধুর রিবোফ্ল্যাভিন, নিকোটিনিক এ্যাসিড ইত্যাদি মানবদেহের সুস্থতা ও সজীবতা রক্ষা করে। মধুতে বিদ্যমান ভিটামিন বি আমাদের ¯œায়ুমন্ডলীকে সুস্থ, সবল ও সতেজ রাখে। মধুর ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম শরীরের হাড় গঠনের জন্য অতীব প্রয়োজনীয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, প্রতি ২০০ গ্রাম মধুতে ১.১৩৫ কেজি পরিমাণ দুধ বা ১০টি ডিমের সমান পুষ্টিমান রয়েছে। দুধ বা অন্যান্য খাদ্যের সাথে মিশিয়ে মধু পান করলে শরীরের শক্তি বৃদ্ধি হয়। জ্যাম, জেলি এবং সিরাপ প্রস্তুতিতে শর্করার পরিবর্তে মধু ব্যবহৃত হয়। বিস্কিট, পুডিং ও কেক তৈরীকালে মধু ব্যবহার করা হয়। প্রাতঃকালীন ভোজে এমনকি পরিপাকজনিত ত্রæটি হলেও মধু ¯^াস্থ্যকর পানীয়রূপে সেবন করা যেতে পারে।
আয়ুর্বেদীয় ও ইউনানি পদ্ধতিতে তৈরী বেশিরভাগ ঔষধের অন্যতম উপাদান হচ্ছে মধু। সর্দি, শরীরের ব্যাথা বেদনা, শ্বাসকষ্ট ও জ্বরের ক্ষেত্রে মধু বিশেষ উপকারী। বহু প্রাচীনকাল হতেই মধু বিভিন্ন প্রকার ঔষধ প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শরীরের ঘা, ক্ষত ও পোড়া জায়গায় মধু লাগালে উপশম হয়। বহুমূত্র, এলার্জি, গ্যাস্ট্রিক এবং আলসার ইত্যাদি রোগের ওষুধ হিসেবে মধু বেশ ফলদায়ক। জিহŸার আলসার সারানোতে মধু ব্যবহার হয়। চির রোগীদের জন্য নিয়মিত মধু সেবন বেশ ফলদায়ক। বিভিন্ন প্রকার হোমিওপ্যাথিক ঔষধের বাহক হিসেবেও মধু ব্যবহৃত হয়। পরাগরেণু ও মধু মিশ্রিত খাদ্য (মৌরুটি) ক্যান্সার নিরাময়ে সাহায্য করে। টাইফয়েড এবং আমাশয় রোগের জীবাণুও মধু খেলে মারা যায়। শিশুদের অপুষ্টি রোগ, রক্ত ¯^প্লতা, নিদ্রাহীনতা এবং সর্দি কাশিতে দুধ ও মধু উপকারী। মধু মিশ্রিত লেবু চা সেবন যাবতীয় যকৃত গোলযোগে উপকার প্রদান করে।মধু রোগ নিরামক, রোগ প্রতিরোধক ও জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং এক বছরের অধিক বয়সের শিশুর পুষ্টি উন্নয়নে মধু পান খুবই কার্যকরী। নিয়মিত ও পরিমিত মধু ব্যবহারে পরিপাকে সহায়তা করে, ঠান্ডায় উপশম করে, ক্ষুধা বাড়ায়, স্মৃতি শক্তি বৃদ্ধি ও তীক্ষè করে এবং বার্ধক্য কমায়। মধু ও দারুচিনির গুড়া মিশিয়ে নিয়মিত পান করলে শরীরে কোলেস্টেরল বা চর্বি জমতে পারে না। (সকালের নাস্তার আধঘন্টা আগে খালি পেটে এবং রাত্রে ঘুমানোর আগে ১ চামচ মধু ও ১ চামচ দারুচিনির গুড়া ১ কাপ গরম পানিতে মিশিয়ে সেবন)। হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে মধু সেবন করলে মূত্রথলির জীবাণু ধ্বংস হয়। নিয়মিত মধু সেবনে পাকস্থলীতে গ্যাস্ট্রিকজনিত ব্যাথা দূর হয়। অনিদ্রা দূর করতে ঘুমানোর আগে ১ গ্লাস সামান্য গরম পানির সাথে ২/৩ চামচ মধু মিশিয়ে পান করলে গভীর ঘুম হয়। মহিলাদের লিকুরিয়া বা শ্বেতপ্রদ রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে প্রতিদিন খালি পেটে মধুর শরবত পান খুবই কার্যকর। সুতরাং মধু যে মানুষের জন্য রোগ প্রতিষেধক তা অ¯^ীকার করার কোন পথ নেই। কুরআর শরীফের সূরা নাহলের এ দুই আয়াত থেকে এ কথা প্রমাণীত হয় কুরআনের প্রতিটি আয়াত এমনকি প্রতিটি শব্দও বিজ্ঞানময়। আমরা যদি সাহাবা ও তাবেইদের মত জীবন গঠন করি তবে কুরআনের সকল রহস্য তথা সৃষ্টির সকল রহস্য আমাদের সামনে আল্লাহ তায়ালা উন্মোচন করে দিবেন আব্ার আমরা সকল জ্ঞান বিজ্ঞানে পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিতে পারব ইনশা আল্লাহ ।

লেখক : মোহাম্মদ জুনায়েদ
গবেষণা কর্মকর্তা
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন