আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- সকাল ৮:২২

আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

কিসাস ও হুদুদ

কিসাসের পরিচয়
শাব্দিক অর্থ : ‘কিসাস’ শব্দটি ‘ক্বফ’ বর্ণে যের এর সাথে। মূলধাতু ق،ص،ص। এর একাধিক অর্থ রয়েছে। যথা : تَتَبُّعُ الْأَثَرِ কোনো নিদর্শনের অনুসরণ করা, عُقُوْبَةٌ শাস্তি, مُمَاثَلَةٌ সমতা। এ তিনটি অর্থই কিসাসের মধ্যে পাওয়া যায়। কেননা, কিসাস গ্রহণকারী কিসাস গ্রহণ করে অপরাধীর অনুসরণ করে। এর মাধ্যমে তাকে শাস্তি দেয়া হয় এবং সে শাস্তি তার কৃত অপরাধের সমান হয়। (আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু-৭/৫৭৭)

কুরআনুল কারীমে তার ব্যবহার
অনুসরণ করা অর্থে কিসাস শব্দটি কুরআনুল কারীমে ব্যবহৃত হয়েছে। খিজির আ. এর সাথে মূসা আ. এর সাক্ষাত করার ঘটনা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গে ইরশাদ হয়েছে,
فَارْتَدَّا عَلَى آثَارِهِمَا قَصَصًا
অর্থ : অতঃপর তারা ¯^ীয় পদচিহ্ন ধরে ফিরে চললো। (সূরা কাহাফ, আয়াত নং ৬৪)
আরেক আয়াতে ইরশাদ হয়েছে,
وَقَالَتْ لِاُخْتِهِ قُصِّيْهِ.
অর্থ : সে মূসা আ. এর বোনকে বললো তার পেছনে পেছনে যাও। (সূরা কাসাস, আয়াত নং ১১)
উল্লিখিত প্রথম আয়াতে قَصَصًا শব্দটি এবং দ্বিতীয় আয়াতে قُصِّيْهِ শব্দটি অনুসরণ করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

পারিভাষিক অর্থ : কিসাসের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লামা সায়্যিদ জুরজানী রহ. বলেন,
الْقِصَاصُ أنْ يَفْعَلَ بِالْفَاعِلِ الْجَانِيْ مِثْلَ مَا فَعَلَ.
অর্থ : কিসাস হলো অপরাধী ব্যক্তির সাথে তার কৃত অপরাধের সমান শাস্তি দেয়া। (আততারীফাত-১/২২৫)
আল্লামা ইবনুল আসীর রহ. বলেন, الْقِصَاصُ وَهُوَ أنْ يَفْعَلَ بِهِ مِثْلَ فِعْلِهِ مِنْ قَتْلٍ أوْ قَطْعٍ أوْ ضَرْبٍ أوْ جَرْحٍ.
অর্থ : কেসাস হলো অপরাধীকে তার কৃত অপরাধের সমান শাস্তি দেয়া। চাই তা হত্যা হোক, কোনো অঙ্গচ্ছেদ হোক, প্রহার হোক কিংবা ক্ষত হোক। (আন নিহায়া ফী গরীবিল হাদীস-৪/১১৩)

কিসাসের বৈধতা
কিসাসের বৈধতা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও যুক্তির আলোকে প্রমাণীত। এর বহুবিদ ফায়দাও রয়েছে। নি¤েœ দলীলের আলোকে তার বৈধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করা হলো।

কুরআনের আলোকে কিসাস
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِصَاصُ فِي الْقَتْلَى الْحُرُّ بِالْحُرِّ وَالْعَبْدُ بِالْعَبْدِ وَالْأُنْثَى بِالْأُنْثَى فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتِّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ وَأَدَاءٌ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ ذَلِكَ تَخْفِيفٌ مِنْ رَبِّكُمْ وَرَحْمَةٌ فَمَنِ اعْتَدَى بَعْدَ ذَلِكَ فَلَهُ عَذَابٌ أَلِيمٌ.
অর্থ : হে মুমিনগণ! নিহতদের ব্যাপারে তোমাদের জন্য কিসাসের বিধান দেয়া হয়েছে। ¯^াধীন ব্যক্তির পরিবর্তে ¯^াধীন ব্যক্তি, ক্রীতদাসের পরিবর্তে ক্রীতদাস, নারীর পরিবর্তে নারী। আর তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কিছুটা ক্ষমা করা হলে যথাযত নিয়মের অনুসরণ এবং তার পাওনা আদায় করে দেয়া বিধেয়। এটা তোমার রবের পক্ষ থেকে সহজতা ও দয়া। এরপরও যে সীমালংঘন করে তার জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৭৮)
আরো ইরশাদ হচ্ছে,
وَلَكُمْ فِي الْقِصَاصِ حَيَاةٌ يَا أُولِي الْأَلْبَابِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ.
অর্থ : হে জ্ঞানীগণ! কিসাসের মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য জীবন। (সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৭৯)
আরো ইরশাদ করেছেন,
وَكَتَبْنَا عَلَيْهِمْ فِيهَا أَنَّ النَّفْسَ بِالنَّفْسِ وَالْعَيْنَ بِالْعَيْنِ وَالْأَنْفَ بِالْأَنْفِ وَالْأُذُنَ بِاالْأُذُنِ وَالسِّنَّ بِالسِّنِّ وَالْجُرُوحَ قِصَاصٌ
অর্থ : আমি তাদের জন্য বিধান দিয়েছি প্রাণের পরিবর্তে প্রাণ, চোখের পরিবর্তে চোখ, নাকের পরিবর্তে নাক, কানের পরিবর্তে কান, দাঁতের পরিবর্তে দাঁত, যখমের পরিবর্তে যখম।
(সূরা মায়েদা, আয়াত নং ৪৫)

হাদীসের আলোকে কিসাস :
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم لاَ يَحِلُّ دَمُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ يَشْهَدُ أنْ لاَ إلَهَ إلَّا اللهُ وَأَنِّيْ رَسُوْلُ اللهِ إلَّا بإحْدَىْ ثَلاَثٍ الثَّيِّبُ الزَّانِيُ وَالنَّفْسُ بِالنَّفْسِ وَالتَّارِكُ لِدِيْنِهِ الْمُفَارِقُ لِلْجَمَاعَةِ.
অর্থ : বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মুসলমান এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ তা’আলা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই আর আমি (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহ তা’আলার রাসূল, তাহলে তার রক্ত হালাল নয়। তবে তিন প্রকার ব্যক্তির হুকুম ভিন্ন। যথা : বিবাহিত যিনাকারী, প্রাণের বদলে প্রাণ, দ্বীন ত্যাগকারী, জামাত ত্যাগকারী। (জামে তিরমিযী, হাদীস নং ১৪০২)
وقال ابن عبيد قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ্রمَنْ قُتِلَ فِىْ عِمْيا فى رَمْىٍ يَكُوْنُ بَيْنَهُمْ بِحِجاَرَةٍ أوْ ضَرْبٍ بالسِّيَاطِ أوْ ضَرْبٍ بِعَصًا فهُوَ خَطَأٌ وعَقْلُهُ عَقْلُ الخَطَإِ ومَنْ قُتِلَ عَمَدًا فهُوَ قَوَدٌগ্ধ.
অর্থ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মুসলমানের হত্যাকারী জানা নেই, আর সে মারা গেছে কোনো পাথরের আঘাতে, কিংবা চাবুকের আঘাতে, অথবা কোনো লাঠির আঘাতে তাহলে তা ভুলক্রমে হত্যার হুকুমে হবে। তার দিয়ত ভুলক্রমে হত্যার দিয়তের মত হবে। আর যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হবে তার হত্যাকারী থেকে কিসাস নেয়া হবে।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৫৪১)

ইজমার আলোকে কিসাস :
وَأَجْمَعَتِ الأُمَّةُ عَلَى وُجُوْبِ الْقِصَاصِ.
অর্থ : সকল উম্মত এ ব্যাপারে একমত যে কিসাস ওয়াজিব। (আলফিকহুল ইসলামী ওয়াআদিল্লাতুহু-৭/৫৭৭)

যুক্তির আলোকে কিসাস :
والعقلُ يَقْضِي بتَشْرِيْع القِصاص، إمَّا عَدالةً بأنْ يُفعَلَ بالقاتل مِثلَ جِنايته، وإمَّا مَصْلحةً بتَوْفِيْر الأمْن العامِّ وصَوْن الدِّمَاء، وحِمَايَة الأنفُسِ، وزَجْرِ الُجنَاة، ولا يَتَحَقَّقُ ذلك إلا به، فلا يُلتفتُ إلى الدَّعَاوِى والْمَزَاعِم القائلة بأنَّ فيه تَهْديماً جديداً للبِنْيَة الإنْسانيَّة؛ لأنَّ في تَشْريعه صَوْنَ حقِّ الحياة للمُجْتَمَع.
অর্থ : মানুষের বিবেক কিসাস বৈধ হওয়াকে সমর্থন করে। ইনসাফের দৃষ্টিতেও কিসাস বৈধ। এভাবে যে, হত্যাকারীর সাথে তার কৃত অপরাধের সমান আচরণ করা হবে। আর এটাই ইনসাফ। কল্যাণের অর্থেও কিসাস বৈধ। এভাবে যে, ব্যাপক নিরাপত্তা, মানুষের রক্ত হিফাযত, মানুষের জীবন রক্ষা ও অপরাধীদেরকে অপরাধ থেকে বিরত রাখার জন্য। আর এটি কিসাস ব্যতীত প্রতিষ্ঠা হয় না। সুতরাং এ কথার দিকে কর্ণপাত করা হবে না যে, কিসাসের মাধ্যমে মানুষেকে ধ্বংস করা হয়। কেননা কিসাস এর মাধ্যমে মানব ধ্বংস নয় বরং মানুষের জীবনের হিফাযত হয়।
(আলফিকহুল ইসলামী ওয়াআদিল্লাতুহু-৭/৫৭৭)
কিসাসের হুকুম :
কিসাসের হুকুম সম্পর্কে আলমাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আলকুয়েতিয়্যাতে উল্লেখ করা হয়েছে,
اتَّفَقَ الفُقهاءُ عَلَى أنَّ حُكمَ القِصاصِ الوجوبُ عَلَى وَلِيِّ الأمْر إذَا رَفَعَ إليْه مِنْ مُسْتَحِقِّه، ومُبَاح طَلَبُهُ مِنْ قِبَل مُسْتَحِقِّه إذَا اسْتَوْفَى شُروطه، فَلَهُ أنْ يُطالبَ به، وله أنْ يُصالحَ عليه، وله أنْ يَعْفُوَ عنه، والعفوُ أفْضلُ، ثم الصُّلحُ. وسَواء في ذلك كُلِّه أنْ تَكونَ الجنايةُ على النفس أو على ما دُوْنها.
অর্থ : সমস্ত ফুকাহায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, কিসাসের হুকুম হলো ওয়াজিব। আর তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলগণের উপর। যখন যথাযথ ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার দাবি পেশ করা হবে। আর শর্তসমূহ পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের জন্য দাবি জানানো জায়েয। তারা চাইলে আপোষরফাও করতে পারে আবার চাইলে ক্ষমাও করতে পারে। ক্ষমা করা উত্তম। অতঃপর উত্তম হলো আপোষরফা করা। (আলমাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আলকুয়েতিয়্যাহ-৩৩/২৬০)

হুদুদের পরিচয়
শাব্দিক অর্থ : ‘হুদুদ’ শব্দটি বহুবচন। তার একবচন হলো ‘হদ্দ’। এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। যথা : নিষেধ করা, দুই জিনিসের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা। কোনো জিনিসের সীমার ক্ষেত্রেও হদ্দ শব্দটি ব্যবহার হয়। কেননা, এখানেও নিষেধের অর্থ পাওয়া যায়। এভাবে যে, কোনো জিনিসের সীমা তার ভেতরে অন্য জিনিস প্রবেশ করতে এবং তার অন্তর্ভুক্ত কোনো জিনিস বের হতে নিষেধ করে। এ অর্থে কুরআনুল কারীম ও হাদীস শরীফে তার ব্যবহার পাওয়া যায়।
কুরআনুল কারীমে তার ব্যবহার :
وَلَا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَا كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ.
অর্থ : আর তোমরা মসজিদে ইতেকাফ করা অবস্থায় তাদের সাথে সহবাস করো না। এইগুলো আল্লাহ তা’আলার সীমারেখা। সুতরাং এগুলোর নিকটবর্তী হবে না। এভাবে আল্লাহ তা’আলা তার নিদর্শনাবলী মানব জাতির জন্য স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে।
(সূরা বাকারা, আয়াত নং ১৮৭)
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِّقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَنْ يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ.
অর্থ : হে নবী! আপনি (আপনার উম্মতকে বলে দিন) তোমরা যখন তোমাদের স্ত্রীগণকে তালাক দিতে ইচ্ছা কর তখন তাদেরকে ইদ্দতের প্রতি খেয়াল রেখে তালাক দিবে এবং তোমরা ইদ্দতের হিসাব রেখো। আর তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলাকে ভয় কর। তোমরা তাদেরকে তাদের ঘর থেকে বের করো না। আর তারাও যেন নিজেরা বের না হয়। যতক্ষণ না তারা সুস্পষ্ট অপরাধে লিপ্ত না হয়। এগুলো আল্লাহ তা’আলার সীমারেখা। যে আল্লাহ তা’আলার সীমারেখা লংঘন করে সে তো নিজেই নিজের উপর জুলুম করে। (সূরা তালাক, আয়াত নং ০১)

হাদীস শরীফে তার ব্যবহার :
عَنْ أبِيْ ثَعْلَبَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ : إنَّ اللهَ فَرَضَ فَرَائِضَ فَلاَ تُضَيِّعُوْهَا وَنَهَى عَنْ أَشْيَاءَ فَلاَ تَنْتَهِكُوْهَا وَحَدَّ حُدُوْدًا فَلاَ تَعْتَدُوْهَا وَغَفَلَ عَنْ أَشْيَاءَ مِنْ غَيْرِ نِسْيَانٍ فَلاَ تَبْحَثُوْا عَنْهَا.
অর্থ : হযরত আবু সা’লাবা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা’আলা কিছু বিষয় ফরজ করেছেন, তোমরা তা নষ্ট করো না। তিনি কিছু বিষয় করতে নিষেধ করেছেন তোমরা তা লংঘন করো না। তিনি কিছু সীমারেখা দিয়ে দিয়েছেন তা তোমরা অতিক্রম করো না। আবার কিছু বিষয় থেকে তিনি জেনেশুনেই চুপ থেকেছেন। সেগুলো সম্পর্কে তোমরা আলোচনা করো না। (আলমু’জামুল আওসাত, তবরানী, হাদীস নং ৫৮৯)

পারিভাষিক অর্থ :
হদ্দের পারিভাষিক অর্থ হলো,
الْحَدُّ هُوَ عُقُوْبَةٌ مُقَدَّرَةٌ وَجَبَتْ حَقًّا للهِ تَعَالَى.
তথা নির্ধারিত শাস্তি যা আল্লাহ তা’আলার হক্ক হিসেবে ওয়াজিব। (রদ্দুল মুহতার-৪/৩)

কিসাস ও হুদুদের মধ্যে পার্থক্য :
কিসাস ও হুদুদ উভয়টিই অপরাধের শাস্তি। তবে কিসাসের মধ্যে বান্দার হক প্রবল। আর হুদুদের মধ্যে আল্লাহ তা’আলার হক প্রবল।

হুদুদের হুকুম :
হদ্দ হলো ওয়াজিব। বিচারকের নিকট অপরাধ প্রমাণিত হলে তাতে আর কোনো সুপারিশ করা যায় না। হাদীস শরীফে এ জাতীয় সুপারিশের ক্ষেত্রে কঠোর ধমকী এসেছে।
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا أَنَّ قُرَيْشًا أَهَمَّهُمْ شَأْنُ الْمَرْأَةِ الْمَخْزُومِيَّةِ الَّتِي سَرَقَتْ فَقَالُوا وَمَنْ يُكَلِّمُ فِيهَا رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالُوا وَمَنْ يَجْتَرِئُ عَلَيْهِ إِلَّا أُسَامَةُ بْنُ زَيْدٍ حِبُّ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَكَلَّمَهُ أُسَامَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَتَشْفَعُ فِي حَدٍّ مِنْ حُدُودِ اللَّهِ ثُمَّ قَامَ فَاخْتَطَبَ ثُمَّ قَالَ إِنَّمَا أَهْلَكَ الَّذِينَ قَبْلَكُمْ أَنَّهُمْ كَانُوا إِذَا سَرَقَ فِيهِمْ الشَّرِيفُ تَرَكُوهُ وَإِذَا سَرَقَ فِيهِمْ الضَّعِيفُ أَقَامُوا عَلَيْهِ الْحَدَّ وَايْمُ اللَّهِ لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا.
অর্থ : হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, মাখজুমিয়্যা গোত্রের এক মহিলার চুরি করার ব্যাপারটি কুরাইশদেরকে চিন্তিত করল। তারা বললো এ ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে কে কথা বলবে ? তখন তারা বললো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয়ভাজন উসামা ইবনে যায়েদ ছাড়া আর কে কথা বলার সাহস রাখে ? উসামা ইবনে যায়েদ রাসূলের সাথে কথা বললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত হদ্দের ব্যাপারে সুপারিশ করছো ? অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাঁড়িয়ে ভাষণ দিলেন। বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে এ কারণে ধ্বংস করা হয়েছে যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করতো তখন তাকে তারা ছেড়ে দিত। আর যখন দুর্বল কেউ চুরি করতো তখন তার উপর হদ্দ কায়েম করতো। আল্লাহ তা’আলার কসম! যদি ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদও চুরি করতো তাহলে আমি তার হাত কেটে দিতাম। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪৭৫)
عَنْ يَحْيَى بْنِ رَاشِدٍ قَالَ جَلَسْنَا لِعَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ فَخَرَجَ إلَيْنَا فَجَلَسَ فَقَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَقُوْلُ ্রمَنْ حاَلَتْ شَفَاعَتُهُ دُوْنَ حَدٍّ مِنْ حُدُوْدِ اللهِ فَقَدْ ضَادَ اللهَ وَمَنْ خَاصَمَ فِىْ بَاطِلٍ وَهُوَ يَعْلَمُهُ لَمْ يَزَلْ فِىْ سَخَطِ اللهِ حَتَّى يَنْزَعَ عَنْهُ وَمَنْ قَالَ فِىْ مُؤْمِنٍ مَا لَيْسَ فِيْهِ أسْكَنَهُ اللهُ رَدْغَةَ الْخَبَالِ حَتَّى يَخْرُجَ مِمَّا قَالَগ্ধ.
অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, কোনো হদ্দ কায়েম করার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তির সুপারিশ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে সে যেন আল্লাহ তা’আলার বিরোধিতা করলো। আর যে ব্যক্তি জেনেশুনে কোনো বাতিলের পক্ষে ঝগড়া করলো, যতক্ষন না সে তার থেকে বের হয়ে আসবে ততক্ষণ সে আল্লাহ তা’আলার ক্রোধের মধ্যে থাকে। যে ব্যক্তি কোনো মু’মিনের ব্যাপারে এমন কোনো কথা বললো যা তার মধ্যে নেই তাহলে সে যতক্ষণ না তার থেকে বের হবে ততক্ষণ তাকে আল্লাহ তা’আলা জাহান্নামীদের পূঁজের মধ্যে রাখবেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীন নং ৩৫৯৯)

হুদুদের বিভিন্ন প্রকার ও সেগুলোর হুকুম সমূহ :
হদ্দ ছয় প্রকার। যথা : ১। যিনার হদ্দ ২। মদ পানের হদ্দ ৩। নেশার হদ্দ ৪। মিথ্যা অপবাদের হদ্দ ৫। চুরির হদ্দ ৬। ডাকাতির হদ্দ। (রদ্দুল মুহতার-৪/৩)
নিম্মে প্রত্যেকটির হুকুম উল্লেখ করা হলো।

যিনার হদ্দ
অবৈধভাবে কোনো ব্যক্তি কোনো মহিলার সাথে সহবাস করাকে যিনা বলে। যদি কোনো ব্যক্তি এমন কাজে লিপ্ত হয় তাহলে তার শাস্তি হলো, অবিবাহিত হলে তাকে একশ বেত্রাঘাত করা হবে। আর বিবাহিত হলে রজম করা হবে। পুরুষকে রজম করার জন্য গর্ত করার প্রয়োজন নেই। তবে মহিলাকে রজম করতে হলে গর্ত করতে হবে। রজম হলো পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা।
(সূরা নূর, আয়াত নং ০২)

মদ পানের হদ্দ
যদি কেউ মদ পান করে তাহলে তাকে বেত্রাঘাত করে তার উপর হদ্দ কায়েম করা হবে। এ অপরাধের জন্য তাকে আশি বেত্রাঘাত করা হবে। (রদ্দুল মুহতার-৪/৪০)

নেশার হদ্দ
নেশা জাতীয় জিনিস পান করার পর যদি তার নেশা সৃষ্টি হয়ে যায় তাহলে তার উপর হদ্দ কায়েম করা হবে। আর এ অপরাধের শাস্তি হলো তাকে আশি বেত্রাঘাত করা হবে। (মাজমাউল আনহুর-২/৩৫৯-৩৬০)

মিথ্যা অপবাদের হদ্দ
মিথ্যা অপবাদ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কাউকে ব্যভিচারের অপবাদ দেয়া। একে হদ্দে কযফ বলে। যদি কেউ এমনটি করে আর তা প্রমাণ করতে না পারে তাহলে তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। এ অপরাধের শাস্তি হলো মদ পানের শাস্তির মত। অর্থাৎ তাকে আশি বেত্রাগাত করা হবে। (সূরা নূর, আয়াত নং ০৪)

চুরির হদ্দ
যদি কোনো ব্যক্তি দশ দেরহাম তথা দুই ভরি দশ আনা রূপার মূল্য সমপরিমাণ জিনিস চুরি করে তাহলে তার উপর চুরির হদ্দ কায়েম করা হবে। আর চুরির শাস্তি হলো হাত কর্তন করা।
(সূরা মায়েদা, আয়াত নং ৩৮)

ডাকাতির হদ্দ
ডাকাতির বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। সকল প্রকারের হুকুম এক রকম নয়। নি¤েœ প্রত্যেক প্রকার হুকুমসহ উল্লেখ করা হলো।
১. সম্পদ লুণ্ঠণ করেছে এবং তাকে হত্যা করেছে। এ অপরাধের শাস্তি হলো শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা।
২. হত্যা করেছে তবে কোনো সম্পদ নেয়নি। এর শাস্তি হলো তাকে হত্যার বদলে হত্যা করা হবে।
৩. সম্পদ লুণ্ঠন করেছে তবে হত্যা করেনি। এর শস্তি হলো তার হাত-পা উল্টো দিক থেকে কেটে দেয়া হবে।
৪. ভয় দেখিয়েছে তবে হত্যা করেনি আর সম্পদও লুন্ঠণ করেনি। এ ব্যক্তিকে বন্দি করা হবে যতক্ষণ না সে তাওবা করবে কিংবা মৃত্যু বরণ করবে।
৫. জখম করেছে তবে হত্যা করেনি আর সম্পদও লুণ্ঠন করেনি। এ অপরাধের জন্য তার থেকে কেসাস নেয়া হবে।
৬. জখম করেছে এবং সম্পদও লুণ্ঠন করেছে।
৭. জখম করেছে এবং হত্যা করেছে।
৮. জখম করেছে এবং হত্যা করেছে। আর সম্পদও লুন্ঠন করেছে।
এ তিন প্রকার অপরাধের থেকে জখমের জন্য তার থেকে কিসাস নেয়া হবে। আর বাকি অপরাধের জন্য তার উপর হদ্দ কায়েম করা হবে। (সূরা মায়েদা, আয়াত নং ৩৩, আননুতাফ ফিল ফাতাওয়া-৪০৩, ৪০৪)

লেখক : মাওলানা তাওহিদুল ইসলাম

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন