আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- সকাল ৬:৪৬

আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

নোবেল পুরস্কার

১৯৭১-এ আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ‘দ্যা কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ নির্দ্বিধায় অংশগ্রহণকারী মার্কিণ গীতিকার বব ডিলানের ২০১৬ সালে নোবেল পুরষ্কারে মনোনীত হবার ঘোষণা পরবর্তি তার নিরবতায় আমাদের দেশে নোবেল পুরষ্কার নিয়ে পুরোনো আলোচনা নতুন করে প্রানবন্ত হয়। তাই ছাত্র সমাচার পাঠক সমীপে এই লেখনীর সূত্রপাত।
নোবেল পুরস্কার। বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ বিষয়ভিত্তিক সাংবৎসরিক একটি পুরস্কার। ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার কার্যকর করার পর শত বছর পেরিয়ে গেছে। প্রতি বছর বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গৌরব অর্জন করছেন অনেকেই। অখ্যাত থেকে বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন কেউ কেউ। কিন্তু এই নোবেল পুরস্কার নির্বাচন প্রক্রিয়া, মনোনয়ন, নোবেল বিজয়ী, নোবেল পাওয়া থেকে ব্যক্তিবিশেষকে বঞ্চিত করা ইত্যাদি বিষয়ে বিতর্ক আর অভিযোগের শেষ নেই। এর পেছনে বিজারক হিসেবে কাজ করেছে রাজনীতিসহ নানা ধরনের বাস্তবতা। তাই আসুন, জেনে নেই নোবেল পুরষ্কারের ইতিবৃত্ত ।
১৯০১ খ্রিস্টাব্দে (সুয়েডীয় : ঘড়নবষঢ়ৎরংবঃ নোবেলপ্রীসেৎ) নোবেল পুরস্কার প্রবর্তিত হয়। ঐ বৎসর থেকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্য সাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণমূলক তুলনারহিত কর্মকাণ্ডের জন্য এই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। মোট ছয়টি বিষয়ে পুরস্কার প্রদান করা হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য ও শান্তি। নোবেল পুরস্কারকে এ সকল ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পদক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদেরকে ইংরেজিতে নোবেল লরিয়েট বলা হয়।
সুইডেনের রসায়ন বিজ্ঞানী ও শিল্পপতি আলফ্রেদ নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইল-এর মর্মানুসারে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। নোবেল মৃত্যুর পূর্বে উইলের মাধ্যমে এই পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা করে যান। শুধুমাত্র শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয় অসলো, নরওয়ে থেকে। বাকি ক্ষেত্রে স্টকহোম, সুইডেনে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন, যার মাধ্যমে তার প্রচুর আয় হয়, আর এই আয়ের অর্থ দ্বারাই তিনি পুরস্কার প্রদানের কথা বলে যান। জীবদ্দশায় নোবেল অনেকগুলো উইল লিখেছিলেন, এর মধ্যে সর্বশেষটি লিখেন তার মৃত্যুর মাত্র এক বছর আগে ২৭ নভেম্বর ১৮৯৫ তারিখে। নোবেলের উদ্ভাবনটি ছিল অনেকাংশেই একটি বিস্ফোরক যা প্রভূত ক্ষতির কারণ হতে পারত। তাই যুদ্ধক্ষেত্রে এই ডিনামাইটের ব্যবহার তাঁকে শঙ্কিত করে তোলে। নোবেল পাঁচটি ক্ষেত্রে পুরস্কার দেয়ার জন্য তার মোট সম্পত্তির শতকরা ৯৪ ভাগ দান করে যান। এর মোট পরিমাণ ৩১ মিলিয়ন এসইকে (৩.৪ মিলিয়ন ইউরো, ৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
অর্থনীতি ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে ১৯০১ সাল থেকেই পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে, কিন্তু অর্থনীতিতে পুরস্কার প্রদান শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সাল থেকে। আলফ্রেদ নোবেল তার উইলে অর্থনীতির কথা উল্লেখ করে যাননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য ১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত পুরস্কার প্রদান বন্ধ ছিল। প্রত্যেক বছর পুরস্কারপ্রাপ্তদের প্রত্যেকে একটি স্বর্ণপদক, একটি সনদ ও নোবেল ফাউন্ডেশন কর্তৃক কিছু পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে এই অর্থের পরিমাণ ছিল ৮০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা। একটি পুরস্কার একসাথে সর্বোচ্চ তিনজন পেয়ে থাকে এবং একজনকে দুটি ভিন্ন কাজের জন্য একাধিক পুরষ্কার দেয়া যায়। নোবেল শান্তি পুরস্কার যে কোন সংস্থাকে প্রদান করা যায় তাছাড়া সকল পুরস্কার শুধু মাত্র জীবন্ত ব্যক্তিকে দেয়া হয়। যদি শান্তি পুরস্কার দেয়া না হয় তবে তার অর্থ বিজ্ঞানের অন্যান্য পুরস্কারে সমান ভাগে ভাগ করে দেয়া হয়। যা এ পর্যন্ত ১৯বার ঘটেছে। মৃত্যু পরবর্তী মনোনয়ন অনুমোদিত না হলেও প্রার্থীর মৃত্যু মনোনয়ন ও নোবেল কমিটির পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহনের মধ্যবর্তী সময়ে হলে তিনি নির্বাচিত বলে বিবেচিত হবেন। ইতিহাসে এমনটি দু’বার হয়েছে। ১৯৩১ সালে সাহিত্যে এরিক এক্সেল কার্লফেল্ড এবং ১৯৬১ সালে শান্তিতে জাতিসংঘের মহাসচিব ড্যাগ হেমার্শেল্ড। নোবেল পুরস্কার প্রদানের ইতিহাসে মাত্র চারজন ব্যক্তি দুইবার নোবেল বিজয়ের সম্মান লাভ করেছেন। মেরি কুরি : পদার্থবিজ্ঞান-১৯০৩ (তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কার) রসায়ন-১৯১১ (বিশুদ্ধ রেডিয়াম পৃথকীকরণ) লিনাস পাউলিং : রসায়ন-১৯৫৪ (অরবিটাল সংকরণ তত্ত্ব) শান্তি-১৯৬২ (নিউক্লিয় শক্তির পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ আইনের বাস্তবায়নের জন্য প্রচেষ্টা) জন বারডিন : পদার্থবিজ্ঞান-১৯৫৬ (ট্রানসিস্টর আবিষ্কার) পদার্থবিজ্ঞান-১৯৬২ (অতিপরিবাহিতার তত্ত্ব) ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার : রসায়ন-১৯৫৮ (ইনসুলিন অণুর গঠন আবিষ্কার) রসায়ন-১৯৮০ (ভাইরাসের নিউক্লিওটাইডের ধারা আবিষ্কার)।

সমালোচনা
পুরস্কার প্রদানের বছর থেকে আমরা যদি পইপই করে নোবেলের ইতিহাস ঘাঁটি তবে বিষয়টির সত্যতা মিলবে। কোনো কোনো নোবেল বিজয়ী বিতর্কিত হয়েছেন শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্য। বিতর্ক এসেছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব সূত্রেও। কখনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল এ পুরস্কারের মাধ্যমে জাতীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। বিতর্ক আছে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি-প্রক্রিয়া নিয়ে। সেজন্য এমন পরামর্শও আসছে যে, নরওয়ের রাজনীতিকদের নিয়ে নোবেল কমিটি গঠনের বদলে এর আন্তর্জাতিকায়ন করা হোক। শত বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই নোবেল পুরস্কার নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের বিস্তারিতে যেতে হলে প্রয়োজন হবে এক মহাকাব্য রচনার। তার অবকাশ অন্তত এখানে নেই। তাই এখানে বিচ্ছিন্ন বিতর্কিত কয়েকটি বিষয়ের ওপর আলোকপাতের করছি। পাঠক চলুন, নোবেল পুরস্কার নিয়ে এখন পর্যন্ত যে বিতর্কগুলো হয়েছে সেদিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।
ভ্রষ্টতা দিয়েই শুরু : পুরস্কার প্রবর্তনের প্রথম বছর সাহিত্যমোদীদের বিশ্বাস ছিল প্রথম সাহিত্যে নোবেল পাবেন লিও টলস্টয়। সত্যি বলতে কিÑ সে সময় তাকে ছাড়া অন্য কাউকে চিন্তা করা কষ্টকর ছিল বৈকি! কিন্তু সুইডিশ একাডেমি সবাইকে বুড়ো আঙুল দেখালেন। তারা মনোনীত করলেন কবি সুলি প্রুধমকে।
পৃথিবীতে অনেক ভালো কাজেরই সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে। সময়ের পরিক্রমায় সেই সমালোচনা থেমেও যায়। কিন্তু নোবেল পুরস্কারের মান নিয়ে কারো মনে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়। অথচ এমন নোবেলজয়ীর দেখা মেলে যাদের নোবেল পুরস্কার দিয়ে নোবেল পুরস্কার প্রশ্নবিদ্ধই হয়েছে। তারা হলেনÑ
হেনরি কিসিঞ্জার : ১৯৭৩ সালে শান্তিতে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ খ্যাত লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী। বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে তার নাম জড়িয়ে আছে।
আইজ্যাক রবিন : ১৯৯৪ তে শান্তিতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীর জনক। হাজার হাজার প্যালাস্টাইনির মৃত্যুর জন্য দায়ী।
শিমন প্যারেজ : ১৯৯৪ তে শান্তিতে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীর জনক। হাজার হাজার প্যালাস্টাইনির মৃত্যর জন্য দায়ী।
কর্ডেল হাল : ১৯৪৫ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ গন্তব্যে যাওয়া ইহুদী শরণার্থী জাহাজ জার্মানিতে ফিরিয়ে দেবার মূল কুশীলব। ওই জাহাজের অনেক মানুষ নাৎসি হত্যাকান্ডের স্বীকার।
মেনাহিম বেগান : ১৯৭৮ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হোতা। হাজার হাজার প্যালাস্টাইনির মৃত্যর জন্য দায়ী।
বারাক ওবামা : ২০০৯ সালে শান্তিতে। চামাচা এবং অ্যাডমায়ারারদের অতি উৎসাহের ফল। ওবামা নিজেও নিশ্চিত নন তিনি কেন পেয়েছেন। হয়ত ভবিষ্যৎ কোন কাজের জন্য আগাম পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে তাকে।
আল গোর : ২০০৭ সালে যৌথ ভাবে শান্তিতে। তিনি পরিবেশ আন্দোলনের জন্য পেয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হল তাঁর মত আরও অনেকেই এমন আন্দোলন করছে।
ওয়াঙ্গারি মাথাই : ২০০৪ সালে শান্তিতে। তিনি মূলত তাঁর নিজ দেশে গাছ লাগানোর আন্দোলনের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন। আমাদের দেশে এমন অনেক পরিবেশ সচেতন রয়েছেন যাদের বৃক্ষরোপন তাঁর থেকেও বেশি।
জিমি কার্টার : ২০০২ সালে শান্তিতে। তিনিও সাবেক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি যে ঠিক কি কারণে পুরস্কার পেয়েছেন তাও অস্পষ্ট।
রিগবেরতা মেঞ্ছ : ১৯৯২ সালে শান্তিতে। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার উপর একটি আত্মজীবনী লিখেছিলেন। তবে সাহিত্যে না পেয়ে শান্তিতে পেয়েছেন।
মিখাইল গর্বাচেভ : ১৯৯০ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন । সন্দেহ নেই তিনি পশ্চিমা দুনিয়ায় শান্তির বন্যা নিয়ে এসেছেন। তবে তাঁর আপন মাতৃভূমির চরম ক্ষতি করে।
জন ম্যাকলোল্ড : ১৯২৩ সালে গবেষণা না করেই ফ্রেড্রিক ব্যান্টিঙ্গের সাথে যৌথ ভাবে চিকিৎসা শাস্ত্রে পুরুস্কৃত; একেবারে মুফতে পুরষ্কার। তিনি ব্যান্টিঙ্গকে ল্যাব ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন কিছু সময়ের জন্য।
ইয়াসির আরাফাত : ১৯৯৪ সালে শান্তিতে। তিনি কি শান্তি এনেছেন তা অনিশ্চিত।
মিল্টন ফ্রিডম্যান : ১৯৭৬ সালে অর্থনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত পুরস্কার পান প্রভাবশালী এই অর্থনীতিবিদ । তিনি যখন পুরস্কার নেন, তখন স্টোকহোমে শত শত বিক্ষোভকারী প্রতিবাদ জানান। তিনি তরুণ বয়সে ইহুদিবাদী জঙ্গি সংগঠন ইরগানের সদস্য ছিলেন। ১৯৪৬ সালে জেরুজালেমে যুক্তরাজ্যের প্রধান কার্যালয়ে বোমা হামলার পেছনেও তার হাত ছিল। ওই হামলায় ৯১ জন নিহত হন।
আল গোর : ২০০৭ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। ২০ কক্ষের আলিশান প্রাসাদে গ্যাস ও বিদ্যুতের অতিরিক্ত অপচয়ের জন্য সমালোচিত ছিলেন মার্কিন এই রাজনীতিক । অথচ তিনিই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি সম্পর্কে সচেতনতা বিকাশে ভূমিকা রাখার জন্য।
এসব নিয়ে নোবেল কমিটিতেও যে অসন্তোষ দানা বাঁধে না এমনটি নয়। যেমন ১৯৩৫ সালে নোবেল কমিটির দুই সদস্য পদত্যাগ করেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়েই বিতর্কটা শুরু হয়েছিল। ওই বছর শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয় জার্মানির শান্তিবাদী লেখক কার্ল ভন ও জিতজকিকে। কিন্তু অনেকেই এটা মেনে নিতে পারেননি। শুরু হয় বিতর্ক। আর বিতর্ক ঠেকাতেই এই পদত্যাগ। শুধু তাই নয়, এতকিছুর পরও ১৯৩৯ সালে কমিটির এক সদস্য ভয়াবহ এক কাণ্ড করে বসেন। তিনি জার্মানির অ্যাডলফ হিটলারকে নোবেল দেওয়ার জন্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ভাগ্যিস এটা হয়নি। হলে কী হতো বলা যায় না!

মুসলিমরাও পেয়েছেন নোবেল
শান্তিতে :
১৯৭৮ সালে আনোয়ার আল সাদাত (২৫ ডিসেম্বর ১৯১৮-৬ অক্টোবর ১৯৮১) মিশরিয় রাজনীতিবিদ।
১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত (২৪ আগষ্ট ১৯২৯-১১ নভেম্বর ২০০৪) ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ।
২০০৩ সালে শিরিন এবাদি (২১ জুন ১৯৪৭) ইরানী মানবাধিকার কর্মী। তিনি প্রথম মুসলিম মহিলা যিনি শান্তিতে নোবেল লাভ করেন।
২০০৫ সালে মোহাম্মেদ এল বারাদেই (১৭ জুন ১৯৪২) মিশরীয় রাজনীতিবিদ।
২০০৬ সালে মুহাম্মদ ইউনুস (২৮ জুন ১৯৪০) বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা।
২০১১ সালে তাওয়াক্কুল কারমান (৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯) ইয়েমেনের মানবাধিকার রক্ষাকর্মী। একজন বিশিষ্ট আরবীয় বসন্তের অগ্রদুত নেত্রী।
২০১৪ মালালা ইউসুফজাই (১২ জুলাই ১৯৯৭) পাকিস্তানী মানবাধিকার কর্মী। যে নারী ও শিশু অধাকার নিয়ে কাজ করছে। ১৭ বছর বয়সে নোবেল বিজয়ী মালালা বর্তমানে সর্বকনিষ্ঠ নোবেল বিজয়ী।
সাহিত্যে :
১৯৮৮ নাগিব মাহফুজ (১১ ডিসেম্বর ১৯১১-৩০ আগষ্ট ২০০৬) মিশরীয় লেখক, আধুনিক আরবি সাহিত্যে তার অবদানের জন্য সুপরিচিত তিনি প্রথম মুসলিম লেখক, যাকে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
২০০৬ ওরহান পামুক (জন্ম ৭ জুন ১৯৫২) তুর্কি লেখক, যিনি তার মাই নেইম ইস রেড নামক বইয়ের জন্য বিখ্যাত তিনি একমাত্র তুর্কি লেখক, যাকে সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।
পদার্থবিদ্যায় :
১৯৭৯ আবদুস সালাম (২৯ জানুয়ারি ১৯২৬-২১ নভেম্বর ১৯৯৬) পাকিস্তানি পর্দাথবিজ্ঞানী
তিনিই প্রথম পাকিস্তানি ব্যাক্তি যে এই পুরস্কার লাভ করেন।তিনি পাকিস্তানের একমাত্র ব্যাক্তি যিনি পর্দাথবিজ্ঞানে নোবেল অর্জন করেন। ঐব ধিং ধ সবসনবৎ ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ রিফব অযসধফরুুধ গঁংষরস পড়সসঁহরঃু, যিরপয ঃযব মড়াবৎহসবহঃ ড়ভ চধশরংঃধহ ফবপষধৎবফ ঃড় নব হড়হ-গঁংষরস রহ চধশরংঃধহ রহ ধ ১৯৭৪ পড়হংঃরঃঁঃরড়হধষ ধসবহফসবহঃ.
রসায়নবিদ্যায় :
১৯৯৯ আহমেদ হাসান (২৬ ফেব্রুয়ারি১৯৪৬ – ২ আগস্ট ২০১৬) মিশরীয় বিজ্ঞানী।
২০১৫ আজিজ সানজার (জন্ম সেপ্টেম্বর ৮, ১৯৪৬) তুর্কি বিজ্ঞানী

নোবেল পুরস্কার প্রাপ্য ছিল যাদের
সময়ের অবিচারে দুষ্টরা যেমন পেয়েছে নোবেল; তেমনি বাদ পড়েছেন ইতিহাসের অনেক গুণীজনও। যেমন :
মহাত্মা গান্ধী : পাঁচ বার মনোনীত হয়েছেন। ১৯৪৯ সালে হঠাত হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হলে নোবেল কমিটির টনক নড়ে। আর তখন একটু বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছিল।
নিকোলাস টেসলা : যারা প্রকৌশল কিংবা পদার্থ বিজ্ঞানে পড়াশোনা করছেন তারা জানেন তাঁর কথা। গোটা আধুনিক প্রাক্টিক্যাল পাওয়ার এবং ট্রান্সমিশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ভিত্তি তিনি করে গিয়েছেন। আক্ষরিক আর্থে তিনি রেডিওর আবিষ্কারক।
লিও টলস্তয় : ওয়ার এন্ড পিস খ্যাত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক এবং সম্ভবত আজ পর্যন্ত জন্ম নেওয়া শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক।
মার্ক টোয়াইন : আধুনিক আমেরিকান উপন্যাসের পুরোধা; যেমন বঙ্কিম চন্দ্র বাংলা উপন্যাসের। বিশ্বরে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্পকার। শিক্ষিত মানুষ খুব কমই আছেন যারা তার বিখ্যাত শিশুতোষ হাকালব্যারী ফিন কিংবা টমসয়ার পডড়েননি।
ডিমিত্রি মেনদেলেভ : মেন্ডেলেফ পিরিয়ডিক টেবিলকে এমনভাবে সংশোধন করেছেন যেন যেকোনো অনাবিস্কৃত মৌল পদার্থের মৌলিক বৈশিষ্ট্যর ধারনা পাওয়া যায়।
আয়ালবার্ট স্কার্টজ : গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া বিধ্বংসী বিশেষত টিউবারকোলসিস রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারক। এর আগের আবিষ্কৃত পেনিসিলিন শুধু গ্রাম পজিটিভ ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী ছিল।
লইস মেইটনার : নিউক্লিয়ার ফিসনে গবেষক, যিনি বলেছিলেন- নিউক্লিয়ার ফিসনের সময় হারানো ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
গিলবার্ট লুইস : কভেলন্ট বন্ড সহ আরো অনেক কিছুর আবিষ্কারক। একাধিকবার মনোনীত হয়েও পুরস্কার পাননি।
ডগ্লাস প্যাশার : একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন আবিষ্কার করেছিলেন সেই আশির দশকে। তাঁর গবেষণার ভিত্তির ওপর কাজ করে তিনজন ২০০৮ সালে নোবেল পান এবং তাঁরা প্যাশনারের অবদানের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।
জুলিয়াস লিলেনফিল্ড : ১৯২৮ সালে তার পেপারের উপর ভিত্তি করেই ১৯৫৬ সালে বাই পোলার জাংশন ট্রানজিস্টার উদ্ভাবনের জন্য নোবেল দেওয়া হয়।
অস্কার হেইল : ১৯৩৬ সালেই ফিল্ড ইফেক্ট ট্রানজিস্টার আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁর পেপারের সাহায্য এই ফিল্ড ইফেক্ট ট্রানজিস্টারের উন্নয়ন করে পরে অন্যরা নোবেল পান।
চাং ইয়াও চাও : (১৯৩০) তার গবেষণার উপর ভিত্তি করে পজিট্রন আবিষ্কারের জন্য ১৯৩৬ সালে অপর আরেকজন পুরস্কৃত হন।
হারম্যান ওয়াই কার : (১৯৫০) ব্যবহারিক এমআরআই ডিজাইন করেন; যদিও তখন এটা ততটা স্বীকৃতি পায়নি। ২০০৩ সালে এমন দুইজন পুরস্কার পান যারা তারই গবেষণার উপর ভিত্তি করেই আধুনিক এমআরআই ডিজাইন করেছিলেন।

নোবেল প্রাইজ গ্রহণ করেননি যারা
ইতিহাস তার আঁচলে সযত্নে এমন নিভৃতচারীদেরও ঠাই দিয়েছে, যারা এমন বিতর্কিত নোবেল গ্রহণ তো করেননি; বরং ফিরিয়ে দিয়েছেন। তারা হলেন :
জন প্ল সাত্রে : ১৯৬৪ সালে সাহিত্য পুরষ্কার।
লি ডাক থো : ১৯৭৩ সালে শান্তিতে পেয়েছিলেন। তবে তিনি যুক্তি দেখিয়েছিলেন তাঁর দেশ ভিয়েতনামে শান্তি আসেনি তাই তিনি পুরষ্কার নিতে অপারগতা দেখিয়েছিলেন।
জাঁ পল সার্ত্রে : ফরাসি লেখক জাঁ পল সার্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান ১৯৬৪ সালে, কিন্তু সে পুরস্কার তিনি গ্রহণ করেননি। তিনি জানান, প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পুরস্কারের প্রতি তার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।
লি দো থো : ১৯৭৩ সালে শান্তিতে অবদান রাখার জন্য নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। অথচ তার নিজ দেশেই তখন শান্তি বিরাজ করছিল না। তাই তিনি নোবেল নেওয়ার কোনো অর্থ খুঁজে পাননি বলে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।
গেরহার্ড ডোমাখ : সালফা শ্রেণিভুক্ত ওষুধ আবিষ্কারের জন্য গেরহার্ড ডোমাখকে ১৯৩৯ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু জার্মান একনায়ক হিটলার তাকে পুরস্কার গ্রহণ থেকে বিরত রাখেন। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে হিটলার শাসনের অবসানের পর নোবেল কমিটি ডোমাখের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে সক্ষম হয়।
এডলফ ফ্রেডরিক জোহান বাটেনান্ড : ১৯৩৮ সালের মতোই পরবর্তী বছর ১৯৩৯ সালে রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল এই জার্মান বিজ্ঞানীকে। তিনি গেরহার্ডের ভাগ্যই বরণ করেছিলেন।
রিচার্ড কান : ১৯৩৮ সালে রসায়নশাস্ত্রে বিশেষ অবদানের জন্য পুরস্কার অর্জন করেন। তিনিও একই কারণে বঞ্চিত হন।

এভাবে শত শত উদাহরণ রয়েছে নোবেল পুরস্কার নিয়ে রাজনৈতিক ও বিবিধ মাত্রিক বিতর্কের। আজো তা অব্যাহত। এ প্রেক্ষাপটে ক্রমেই বিবেকবান মানুষের পক্ষে জোরালো দাবি উঠেছে স্বাধীন নোবেল কমিটি গঠন ও কমিটির আন্তর্জাতিকায়নের। কিন্তু এতে কি এ বিতর্কের অবসান ঘটবে? বাস্তব অভিজ্ঞতা তেমনটি নির্দেশ করে না। তবে বিতর্কের মাত্রা যথাসম্ভব কমিয়ে আনা সম্ভব নোবেল কমিটির আন্তরিক ও নিরপেক্ষ বিচার বিবেচনায়ই। নোবেল কমিটির আন্তর্জাতিকতায় বিপদ আরো বাড়াবে। কারণ তখন নোবেল কমিটি পরাশক্তির ক্রীড়নকে পরিণত হবে। যেমনটি আজ হয়ে আছে আন্তর্জাতিক সংস্থা : বিশ্বব্যাঙ্ক, আইএমএফ, জাতিসঙ্ঘ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। আগে থেকেই নোবেল কমিটির আন্তর্জাতিকায়নের বিপদ থেকে সতর্ক থাকতে হবে বৈ কি।

সম্পূরকÑ
অর্থনীতির পুরস্কারের সবচাইতে বড় অভিযোগ হল এক্ষেত্রে শুধু পশ্চিমা পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে গবেষণার জন্য তা দেয়া হয়। নোবেল নিয়ে সবচাইতে বিতর্ক শান্তি এবং সাহিত্যে পুরস্কার নিয়ে। শান্তি পুরস্কার আক্ষরিক অর্থেই পশ্চিমাদের “খুশি এবং সান্ত্বনা” পুরস্কারে রূপান্তরিত হয়েছে। সাহিত্য পুরস্কার শুরুতেই তার সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। অনেক অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিক এই নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। আবার এমন অনেক লেখক পেয়েছেন যার কারণ অনেক সাহিত্যিক সমালোচকরা খুঁজে পাননা। শরীর বিদ্যা এবং চিকিৎসা শাস্ত্রে অনেক সময় প্রি ম্যাচিউড পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এবং ডিসার্ভিং ব্যক্তি পুরস্কার পাননি । পদার্থ বিজ্ঞান এবং রসায়ন শাস্ত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারে পুরস্কার দেওয়া হয়নি এবং এখানেও অনেক ডিসার্ভিং ব্যক্তি পুরস্কার পাননি। সবচাইতে বড় অভিযোগ এখানে সিংহভাগ পুরস্কার আবিষ্কারের (ডিসকভারি) জন্য দেওয়া হয়; খুব কম ক্ষেত্রেই উদ্ভাবনের (ইনভেনশন) জন্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তবে যুগ যুগ ধরেই শ্র্রোতের বিপরীতেও থেকেছে মানুষ। আর তাই তো দেখা মিলল নোবেল প্রত্যাখ্যানকারী কয়েকজনের। নোবেলের মতো পুরস্কারও তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

লেখক : নূরুল করীম আকরাম

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন