আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- সকাল ৬:৪৬

আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

বাংলার সংস্কৃতি

সংস্কৃতি মানুষের জীবনের একটি বিকশিত ও পরিশীলিত রূপ। জীবন ধারার কাঠামো, বিস্তৃতি ও রূপ বৈচিত্রের বাইরে সংস্কৃতি কোনো ভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনা। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বছর থেকে এ ধারাই অব্যাহত আছে। সংস্কৃতি যদি অপরিবর্তনীয় হতো তা হলে গোটা দুনিয়া জুড়ে মানব জাতির সংস্কৃতি হতো এক ও অভিন্ন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতির বিকাশ দেখা গেছে। এগুলো সবই মানুষের বিভিন্ন জীবন ধারা ও জীবন চর্চার ফল। জীবন চিন্তা ও জীবন দর্শনের ভিত্তিতে সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে এবং তা বিভিন্ন রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানে কালের পরিক্রমায় ভিন্ন ভিন্ন জাতির আগমন ঘটেছে। এবং তাঁরা তাঁদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতি। ইসলামী-জীবন চর্চাই ইসলামী সংস্কৃতি। মুসলমানরা যেভাবে তাদের জীবন গড়ে তোলে ইসলামী সংস্কৃতি ঠিক তেমনি রূপ লাভ করে। মুসলিম সমাজ ছাড়া ইসলামী-সংস্কৃতি বিকশিত হতে পারেনা। তাই এই জনপদে ইসলামের আগমন এবং মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরাই এই নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। তবে বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে তোলার জন্য প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক পটভূমি আলোচনা করা প্রয়োজন। সংগত কারণেই নিবন্ধটিকে তিনটি পর্বে (প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ) বিভক্ত করে আলোচনা করা হলো।

প্রাচীন বাংলার সীমানা
প্রাচীন বাংলার সীমানা নির্ধারণ মোটেই সহজ কাজ নয়। কারণ আজকের যুগে বাংলা বলতে আমরা যে সব এলাকাকে বুঝি প্রাচীন যুগে সে সব এলাকার কোন একটিমাত্র নাম ছিল না। এ সব এলাকার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন নামে আখ্যায়িত হতো। এ সব এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ছিল একাধিক স্বাধীন রাজ্য। তবে মোটামুটিভাবে আমরা প্রাচীন বাংলার সীমা নির্দেশ এভাবে করতে পারি: উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে গারো, খাসিয়া, লুসাই, জয়ন্তিয়া, ত্রিপুরা ও চট্টগ্রামের শৈল শ্রেণী এবং পশ্চিমে বিহারের রাজমহল পাহাড় ও কলিঙ্গ, এ চতু:সীমার মধ্যবর্তী অঞ্চলই সাধারণত বাংলা নামে পরিচিত।১

খৃষ্টীয় সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক সর্বপ্রথম বাংলার এ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত জনপদগুলোকে একত্র করার চেষ্টা করেন। শশাঙ্কের পরে বাংলা গৌড়, পুন্ড্র ও বঙ্গ এ তিনভাগে বিভক্ত ছিল। মুসলমান শাসন আমলেই এ বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্র করার চেষ্টা সফলকাম হয়। বাংলায় পাঠান যুগের পূর্ব থেকে পশ্চিমবঙ্গ ‘গৌড়’ ও পূর্ববঙ্গ ‘বঙ্গ’ এ দু’নামে চিহ্নিত হতো। ষোড়শ শতকে মোগল শাসন আমল থেকে এ সমগ্র এলাকা ‘বাঙ্গালা’ নামে অভিহিত হয়েছে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার আমলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা একত্রে ছিল বাংলাদেশ। ইংরেজ শাসনামলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে পূর্ববঙ্গ ও আসাম স্বতন্ত্র প্রদেশের মর্যাদা পায়। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও বাংলাদেশ তার পূর্ববর্তী সীমানা ফিরে পায়নি। তখন বিহার ও উড়িষ্যা পৃথক প্রদেশের মর্যাদা লাভ করে। নতুন ব্যবস্থায় পূর্ববঙ্গ, দার্জিলিং ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত হয়। আসাম পৃথক প্রদেশের মর্যাদা লাভ করে। ফলে একদিকে বাংলাভাষী সিলেট, কাছাড়, শিলচর ও গোয়ালপাড়া জেলা আসামে থেকে যায় এবং অন্যদিকে পূর্ণিয়া, মানভূম, সিংভূম ও সাঁওতাল পরগণা প্রভৃতি বাংলাভাষী জেলাগুলো বিহারের অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৯৪৭ সালে আসামের সিলেটসহ পূর্ববঙ্গ পূর্বপাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে এ পূর্ব পাকিস্তানই স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়। খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতক অবধি লিখিত গ্রীক ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ-এর বর্ণনা অনুযায়ী গঙ্গার সর্বপশ্চিম ও সর্বপূর্ব দু’ধারার মধ্যবর্তী ব-দ্বীপ

পৃষ্ঠা- ২
অঞ্চলই আসল বঙ্গ। এবং এর প্রায় সবটুকুই (২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া জেলার অংশবিশেষ ছাড়া) বর্তমান
বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত।২

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, বাংলার সমগ্র জনপদ বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলোকে একত্রে ‘বাংলা’ নামকরণ মাত্র কয়েকশ বছর আগের ঘটনা। মুসলমান শাসনামলেই সর্বপ্রথম এ সমগ্র এলাকাকে বাংলা বা বাঙ্গালা নামে অভিহিত করা হয়। সম্রাট আকবরের শাসনামলে সমগ্র বাংলাদেশ সুবা-ই- বাঙ্গালাহ্ নামে পরিচিত হয়। ফার্সী বাঙ্গালাহ্ থেকে পর্তুগীজ ইবহমধষধ বা ঢ়বহমধষধ এবং ইংরেজী ইবহমধষ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। বাংলা নামকরণ সম্পর্কে আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বলেছেন- এদেশের প্রাচীন নাম বঙ্গ এবং এদেশের লোকেরা জমিতে উঁচু উঁচু ‘আল’ বেঁধে বন্যার পানি থেকে জমি রক্ষা করতো। সময়ের ব্যবধানে ‘আল’ শব্দটি দেশের নামের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এভাবে (বঙ্গ+আল) বঙ্গাল শব্দের উৎপত্তি হয়।৩

আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
ভূতাত্তিক এবং নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ফল থেকে জানা যায়, খৃষ্ট জন্মের বহু আগেই সুমের (খুব সম্ভব বর্তমান মিসর) দেশে এক প্লাবন হয়। সম্ভবত মানব সভ্যতার আদি কেন্দ্র এই সুমের দেশ। কি করে এ ব্যাপক বন্যার ছোবল থেকে সেদিন তারা রক্ষা পেয়েছিল এ প্রশ্নটা ঐতিহাসিকদের ভাবিয়ে তোলে। এর জবাব পাওয়া গেল মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে। কুরআন মাজীদ একে হযরত নূহ (আ) এর মহাপ্লাবন বলে অভিহিত করেছে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের মতে তাওহীদে বিশ্বাসীরা সেদিন নূহ (আ) এর জাহাজে চড়ে আত্মরক্ষা করেছিল। ঐতিহাসিকরা এ সত্যটা স্বীকার করে নিয়ে একে কুরআন ও বাইবেলে বর্ণিত মহা প্লাবন বলে উল্লেখ করেছেন।৪

প্রাচীন মৃৎচাকতিতে এ মহাপ্লাবনের বিবরণ লিপিবদ্ধ দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান শতকের তৃতীয় দশকে মেসোপটিমিয়ায় আবিস্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে দেখা যায়, এ মহাপ্লাবন আটফুট পুরো পলি মাটির স্তর সৃষ্টি করে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা মতে, এ মহাপ্লাবনের ফলে পলি স্তরটির নীচের ও ওপরের স্থানীয় সংস্কৃতির মধ্যে একটি পূর্ণচ্ছেদ দেখা যায়। বুঝা যায়, তাতে প্রাক প্লাবন কালের সংস্কৃতি জলমগ্ন হয়ে সম্পুর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে এবং সেখানে প্লাবনোত্তরকালের একটি নতুন সংস্কৃতি আবিস্কৃত হয়েছে।৫

ঐতিহাসিকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বলা যায়, এ সংস্কৃতি হযরত নূহ (আ:)-এর গড়া সংস্কৃতি। প্লাবনের পরে তারাই পত্তন করলেন আজকের মানব গোষ্ঠীর। নূহ (আ:) এর এক পুত্রের নাম ছিল সাম। মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম সেমেটিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার নামানুসারেই। সামের পৌত্র আবিরের পিতার নাম আরফাখশাজ। আবিরের পুত্র য়্যাকতীনের ঘরে জন্ম নেয় আবু ফীর। এই আবূ ফীর সভ্যতার গোড়া পত্তন করতে প্রথমে এলেন সিন্ধু এবং তারপর আরেকটু এগিয়ে গংগার তীরে। যে সমৃদ্ধ সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর বহিরাগত আর্য সভ্যতার বিস্তার ঘটেছে ইতিহাস তাকে আখ্যায়িত করেছে দ্রাবিড় সভ্যতা বলে। দ্রাবিড় সভ্যতার গোড়াপত্তনকারী আবু ফীর হযরত নূহ (আ:) এর সপ্তম স্তরের পুরুষ। আরবী ভাষায় যাকে বলা হয় দ্বার। আবু ফীর ও তার বংশধরদের আবাসস্থল কালক্রমে ‘দ্বার আবু ফীর’ বা দ্রাবিড়ে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে ইতিহাসে এরা দ্রাবিড় জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দার মর্যাদা পায়। পৃথিবীর এ ভূখন্ডে মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন তাদের অক্ষয় কীর্তি। হরপ্পা ও মোহঞ্জোদারোর যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া যায় দ্রাবিড়রাই তার নির্মাতা।৬

সুতরাং এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্বন্ধে নি:সন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশ এক গৌরবময় সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত উন্নত ও সম্মানজনক। যে ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত ও সৌভাগ্যবান ভাবা যায়; যে ঐত্যিহের কথা স্মরণ করে সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বের লজ্জাজনক পরিবেশকে উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়।

বাংলার আদিম অধিবাসী কারা এ নিয়ে মতভেদের অন্ত নেই। প্রাচীনকালে এদেশের সবটুকু সমুদ্র গর্ভ থেকে উত্থিত না হলেও এখানে প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। তাই পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বেও এখানে মনুষ্য বসতি ছিল বলে অনুমান করা হয়। অতি প্রাচীন কালে এখানে আর্যদের আগমনের পূর্বে অন্ততপক্ষে আরো চারটি জাতির নামোল্লেখ করা হয়। এ চারটি জাতি হচ্ছে: নেগ্রিটো, অস্ট্রো-এশিয়াটিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়।
নিগ্রোদের ন্যায় দেহ গঠন যুক্ত এক আদিম জাতির এদেশে বসবাসের কথা অনুমান করা হয়। কালের বিবর্তনে বর্তমানে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিস্ত বিলুপ্ত। প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বে ইন্দোচীন থেকে আসাম হয়ে অষ্ট্রো-এশিয়াটিক
পৃষ্ঠা- ৩
বা অস্ট্রিক জাতি বাংলায় প্রবেশ করে নেগ্রিটোদের উৎখাত করে বলে ধারণা করা হয়। এরাই কোল, ভীল, সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি উপজাতির পূর্ব-পুরুষ রূপে চিহ্নিত। বাংলা ভাষার শব্দে ও বাংলার সংস্কৃতিতে এদের প্রভাব রয়েছে। অস্ট্রো-এশিয়াটিক জাতির সমকালে বা এদের কিছু পরে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে দ্রাবিড় জাতি এদেশে আসে। উন্নততর সভ্যতার ধারক হবার কারণে তারা অস্ট্রো-এশিয়াটিক জাতিকে গ্রাস করে ফেলে। অস্ট্রো-দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণেই আর্য পূর্ব-জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রাক আর্য জনগোষ্ঠীই বাঙ্গালী জনসাধারণের তিন-চতুর্থাংশেরও অধিক দখল করে আছে। আর্যদের পর এদেশে মঙ্গোলীয় বা ভোটচীনীয় জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে। কিন্তু বাংলার মানুষের রক্তের মধ্যে এদের রক্তের মিশ্রণ উল্লেখযোগ্য নয়। বাংলার উত্তর ও উত্তর পূর্ব সীমান্তে এদের অস্তিত্ত রয়েছে। গারো, কোচ, ত্রিপুরা, চাকমা ইত্যাদি উপজাতি এ গোষ্ঠীভুক্ত। পরবর্তীকালে আরব, তুর্কী, মোঙ্গল, ইরানী ও আফগান রক্ত এর সাথে মিশ্রিত হয়। বস্তুত বাঙালী একটি শংকর জাতি হলেও দ্রাবিড়ীয় উপাদান এর সিংহভাগ দখল করে আছে।৭

বাংলার সংস্কৃতি
জীবন পদ্ধতিই হলো সংস্কৃতি। বাংলার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজ নিজ সংস্কৃতি নির্ভর ছিল এবং যোগাযোগের স্বল্পতা হেতু স্ব-স্ব সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র ছিল প্রকট- এতে কোন সন্দেহ নেই।

আদি-অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতি
বাংলার জনসৌধ বিনির্মাণে যাদের অবদান রয়েছে তারা হলো আদি-অস্ট্রেলীয় (চৎড়ঃড় অঁংঃৎড়ষড়রফ) জনগোষ্ঠী। এরা অস্ট্রিক নামে পরিচিত। কুমিল্লা হতে চট্টগ্রাম হয়ে যে পথ নিু বার্মা (মায়ানমার) পর্যন্ত বি¯তৃত সেই পথ ধরে তারা বঙ্গ অঞ্চলে আগমন করে। অস্ট্রেলিয়া ও তাসমেনিয়ার বর্তমান আদিবাসীরা এই অস্ট্রিকদের বংশধর। কারো কারো মতে তারাই বাংলার নব্য-প্রস্তর যুগের জন্মদাতা। এ অঞ্চলে কৃষিকর্মের আদি সূচনার কৃতিত্ব তাদেরই।৮ এদের সভ্যতা ছিল মূলত গ্রাম কেন্দ্রিক। শরৎকুমার রায় মনে করেন, পঞ্চায়েত প্রথা সম্ভবত ভারতে প্রথম এদেরই প্রবর্তিত। পঞ্চায়েতকে এরা সত্যসত্যই ধর্মাধিকরণ জ্ঞানে মান্য করে। এখনও আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার পূর্বে মুন্ডা সাক্ষী তার জাতি-প্রথা অনুসারে পঞ্চের নাম নিয়ে এই বলে শপথ করে: ‘সিরমারে-সিঙ্গবোঙ্গা ওতেরে পঞ্চ’ অর্থাৎ আকাশে সূর্য-দেবতা পৃথিবীতে পঞ্চায়েত।৯

দ্রাবিড়ীয় সংস্কৃতি
আজ থেকে প্রায় হাজার হাজার বছর পূর্বে দ্রাবিড় জাতি পশ্চিম এশিয়া থেকে বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে হিমালয়ান উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তাইগ্রীস, ইউফ্রেতিস নদীর অববাহিকায় জীবন অতিবাহিতকারী দ্রাবিড়রা স্বভাবতই ভারতের বৃহত্তম নদীগুলোর অববাহিকা ও সমুদ্রোপকূলকে নিজেদের আবাসভূমি হিসেবে বেছে নেয়। তাদেরই একটি দল গঙ্গা মোহনায় স্থায়ী বসতি স্থাপন করে উন্নততর সভ্যতা গড়ে তোলে।১০ খৃষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে বাংলার এ দ্রাবিড়দের শৌর্যবীর্য ও পরাক্রমের কাছে স্বয়ং বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডার নতি স্বীকার করেছেন। গ্রীক ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন: এদের চার হাজার সুসজ্জিত রণ-হস্তী ও অসংখ্য রণতরী ছিল। এ জন্য অপর কোন রাজা এদেশ জয় করতে পারেনি। এদের রণ হস্তীর বিবরণ শুনে আলেকজান্ডার এ জাতিকে পরাস্ত করার দুরাশা ত্যাগ করেন। মেগাস্থিনিশ থেকে শুরু করে প্লিনি, প্লতর্ক, টলেমী প্রমুখ সমকালীন গ্রীক ঐতিহাসিক, ভৌগলিক ও পন্ডিতগণ এ সময়কার বাংলার অধিবাসীদের গৌরবোজ্জল সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাক্ষী দিয়ে গেছেন। এ সময় বাংলার রাজা মগধাদি দেশ জয় করে ভারতের পূর্ব সীমান্ত থেকে পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর তীর পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। দু:খের বিষয়, বাংলার এ গৌরবোজ্জল যুগ সম্পর্কে কয়েকজন বিদেশী লেখকের লেখা ছাড়া আমাদের এতদ্দেশীয় বইপত্রে এর কোন উল্লেখ নেই। বরং এদেশের আর্য ধর্মশাস্ত্র পুরাণে বাংলার এ রাজ বংশকে শূদ্র নামে অভিহিত করা হয়েছে। আর্যদের প্রধান ধর্মশাস্ত্র ঋগে¦দে এ দেশের অধিবাসীদেরকে দস্যু বা দাস আখ্যা দেয়া হয়েছে। পুরাণ ও ঋগে¦দের বক্তব্য থেকে বাংলার দ্রাবিড়দের বিরুদ্ধে আর্যদের ক্রোধ ও আক্রোশের প্রমাণ পাওয়া যায়।১১

আর্যদের এ ক্রোধের মূলে কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণই বিদ্যমান নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণও রয়েছে। দ্রাবিড়ীয় ও আর্য সভ্যতার মূল সংঘাত ধর্মীয় ও সংস্কৃতিগত। আর্যরা ছিল মুশরিকী সভ্যতা ও সংস্কৃতির পূর্ণ অনুসারী। তারা অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য, গগন, পবন, ঝড়, বৃষ্টি, সমুদ্র, নদী, বৃক্ষ প্রভৃতির পূজা করতো। পরে প্রস্তর পূজা ও মূর্তি পূজাও
তাদের মধ্যে প্রবেশ করে। যাগ-যজ্ঞ ও বলিদান ছিল তাদের পূজার অঙ্গ। দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য তারা নর বলিদান করতো।১২

পৃষ্ঠা- ৪
আর্য আগমনকালে দ্রাবিড়দের ধর্ম কি ছিল এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট তথ্য জানা না গেলেও আর্যরা যে, দ্রাবিড়দের ধর্মের ঘোর বিরোধী ছিল তা বেদ প্রভৃতি আর্য ধর্ম গ্রন্থাদি থেকে জানা যায়। দ্রাবিড়দের তৈরী যে উন্নততর সিন্ধু সভ্যতাকে আর্যরা ধ্বংস করেছিল তার ধর্ম কি ছিল এ নিয়ে বহু গবেষণার পরও পন্ডিতগণ কোন যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। মোহন-জো-দারো, হরপ্পা ও চানহুদাড়োতে যে সব ক্ষুদ্রাকৃতির মৃত্তিকা নির্মিত খেলনা ও সীল পাওয়া গেছে সেগুলো থেকে কেউ কেউ মুর্তি ও দেব-দেবীর কল্পনা করেছেন। বিভিন্ন বড় বড় বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে এগুলো পাওয়া গেছে। এ বাড়িগুলোর মধ্যে পূজানুষ্ঠানের ন্যায় কিছু নিদর্শন কল্পনা করা হয়েছে। অথচ এ ধরনের কোন কোন বাড়ির ধ্বংসাবশেষকে হয়তো উপসানালয় বলে সন্দেহ করা যায় কিন্তু সেগুলোর মধ্যে কোন বিগ্রহ বেদী বা শিরকীয় ধর্মানুষ্ঠানমূলক অন্য কোন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়নি১৩।

আমাদের মতে সিন্ধু সভ্যতায় ধর্মীয় সংঘাত ছিল। দ্রাবিড়গণ ছিলেন সেমেটিক। কাজেই তাওহীদ ভিত্তিক সংস্কৃতিরও সেখানে অস্তিত্ব ছিল। উপরোক্ত উপাসানালয়গুলো মসজিদ সদৃশ। হরপ্পায় (পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মন্টগোমারী জেলায় অবস্থিত) আবিস্কৃত সুবিশাল ও সুরক্ষিত সৌধের পরিচয় থেকে হুইলার অনুমান করেছেন, সুমের ও আক্কাদের মতই সিন্ধু সাম্রাজ্যও খুব সম্ভব কোন রকম ‘পুরোহিতরাজের’ শাসনে ছিল বা এ শাসন ব্যবস্থার প্রধানতম অঙ্গ ছিল ধর্ম।১৪ সম্ভবত হুইলারের এ অনুমান মিথ্যাা নয়। যুগে যুগে এবং দেশে দেশে আল্লাহ নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁরা মানুষের জীবন পরিশুদ্ধ ও সংস্কারের সাথে সাথে আল্লাহর নির্দেশ ও বিধান অনুযায়ী দেশের শাসন পরিচালনারও ব্যবস্থা করেন। সিন্ধু সাম্রাজ্যে প্রথম দিকে সম্ভবত এ ধরণের কোন নবীর শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত ছিল। নবীর ইন্তিকালের পর সেখানে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটলেও শাসন ব্যবস্থায় তখনও তাওহীদের প্রভাব ছিল। এসময় বহিরাগত পৌত্তলিক ধর্মের অনুসারী আর্যদের সাথে তাদের সংঘর্ষ ও বিরোধ বাধে।

দ্রাবিড়রা আর্যদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত সভ্যতার অধিকারী ছিল। তারা বন্য জন্তু জানোয়ারকে পোষ মানাতে জানতো। গো-পালন ও অশ্বচালনা বিদ্যাও তাদের আয়ত্তাধীন ছিল। কৃষি কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতো। তারা উপাসনালয় ও গৃহ নির্মাণ করা জানতো। মিসর, ব্যাবিলন, আসিরিয়া ও ক্রীটের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। দক্ষিণ ভারতীয় উপকূল দিয়ে তারা ভূমধ্য সাগরীয় দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক ও তামাদ্দুনিক সম্পর্ক কায়েম করেছিল। মোট কথা তারা নাগরিক সভ্যতার অধিকারী ছিল। তাঁরা ছিল সেমেটিক তাওহীদবাদী ধর্মের অনুসারীদের উত্তরসুরী।১৫

আর্যসংস্কৃতি
সত্য ধর্ম বিরোধী এবং পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী আর্যরা ভারতবর্ষে আসে ইরান থেকে। ভারতে প্রবেশ করার পর রাজনৈতিক বিজয়ের সাথে সাথে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিজয় লাভের জন্যও তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। এ প্রসংগে বাংলাদেশ সংস্কৃতি কমিশনের ভাষ্য: ‘‘আর্যরা ভারতবর্ষে আগমন করেছিল একটি নতুন সংস্কৃতি নিয়ে। সমগ্র উত্তর ভারত তাদের করায়ত্ত হয়েছিল। তাদের প্রভাব ও অহমিকায় ভারতবর্ষে একটি নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছিল। তারা আনুগত্যের আহ্বান জানিয়েছিল সকল জাতিকে। যে জাতি তাদের এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেছিল তারা বঙ্গ জাতি।১৬ এই প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে একটি দুর্দান্ত সাহস আমরা লক্ষ্য করি। আমাদের সংস্কৃতির উৎসমূলে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরিশেষে আর্যদের দলীয় শক্তি, উন্নততর অস্ত্র ও কলা-কৌশলের কাছে বাংলার আদিবাসীরা পরাজয় স্বীকার করে। নবাগত শত্র“র ভয়ে তাদের অধিকাংশ দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে সরে আসে। এবং কিছু কিছু অনার্য জাতি লোকালয় থেকে দূরে পাহাড়-পর্বত ও জঙ্গলে আশ্রয় গ্রহণ করে। আবার অনেকেই তাদের অধীনতা স্বীকার করে নেয়। এভাবে মৌর্য বিজয়কাল (খৃষ্ট পূর্ব ৩০০ অব্দ) থেকে এ প্রভাব বিস্তারের কাজ শুরু হয় এবং গুপ্ত রাজত্বকাল (৩২০-৫০০ খৃ.) চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে বাংলাদেশে আর্য ধর্ম ভাষা ও সংস্কৃতি প্রত্যক্ষভাবে শিকড় গড়ে। ১৭

আর্যগণ ছিল লম্বা আকৃতির। তাদের গায়ের রং ছিল ফর্সা এবং নাক ছিল খাড়া। তারা নিজেদের অপরাপর জনগোষ্ঠীর চেয়ে সেরা মনে করতো। নিজেদের ছাড়া অন্যদের তারা বলতো অনার্য। অনার্যদের তারা দস্যূ, অসুর, রাক্ষস ইত্যাদি হিসেবে অভিহিত করেছে। আর্য সমাজে পুরুষেরা অনেক বিয়ে করতে পারতো। নারীগণ একটির বেশি বিয়ে করতে
পারতো না। কালক্রমে আর্য সমাজে চারটি শ্রেণীর সৃষ্টি হয়: ব্রাক্ষণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। ব্রাহ্মণগণ ছিল সমাজের বর্ণশ্রেষ্ঠ। তারা পুরোহিত হিসেবে পূজা-অর্চনা করতো। যারা অস্ত্র চালনা শিখতো এবং যুদ্ধে অংশ নিত তারা ছিল সমাজের দ্বিতীয় শ্রেণী। তাদেরকে বলা হতো ক্ষত্রীয়। সমাজের তৃতীয় শ্রেণীকে বলা হতো বৈশ্য। তারা কৃষিকাজ

পৃষ্ঠা- ৫
ওব্যবসা বাণিজ্য করতো। আর এ তিন শ্রেণীর যারা সেবা করতো তাদেরকে বলা হতো শূদ্র। পরাজিত অনার্যগণ শূদ্র শ্রেণীভুক্ত। আর্যগণ সুতি ও পশমি কাপড় পরতো। নারীগণ সোনা ও রূপার গয়না পরতো। তারা নাচ-গান পছন্দ করতো। দৌড়-ঝাঁপ, শিকার, তীর ছোঁড়া, বর্শা নিক্ষেপ, মল্লযুদ্ধ প্রভৃতিতে তারা খুব আনন্দ পেত। আর্যদের ধর্মগ্রন্থের নাম বেদ।

জৈন সংস্কৃতি
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, আর্য সমাজে ছিল বর্ণবৈষম্য। ব্রাহ্মণগণ নিজেদের সমাজের সেরা মনে করতো। ক্ষত্রীয়গণ ব্রাহ্মণদের বাড়াবাড়িতে খুবই অসন্তুষ্ট ছিল। এমনি এক সময়ে ভারতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব হয়। দুটি ধর্মেরই প্রচারক ছিলেন দু’জন ক্ষত্রীয় রাজকুমার। জৈন ধর্মের প্রচারক বর্ধমান মহাবীর খৃষ্টপূর্ব ৫৯৯ অব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ২৮ বছর বয়:ক্রমকালে মানবতার দুর্দশা দূরীকরণার্থে তিনি গৃহত্যাগ করে সত্যের সন্ধানে বনে-জঙ্গলে কৃচ্ছ্রসাধনে ব্রতী হন। একাদিক্রমে চৌদ্দ বছর ধ্যান, তপস্যা ও কৃচ্ছ্রসাধনার পর তিনি সত্যের সন্ধান লাভ করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধর্ম প্রচারের পর বিহারের বাওয়াপুরী নামক স্থানে তিনি দেহত্যাগ করেন। এ ধর্মের মূল শিক্ষা হচ্ছে অহিংসা পরম ধর্ম। এ অহিংসা মানুষ, জীব-জন্তু, পক্ষী, উদ্ভিদ সবার প্রতি সমানভাবে প্রযুক্ত হবে। পরবর্তীকালে এ অহিংসা হিন্দু ধর্মেরও অংশে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে জৈনধর্ম হিন্দু ধর্মের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।১৮ জৈন ধর্ম একটি সার্বিক জীবন পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলায় কোন একক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। বাংলায় জৈন ধর্মের প্রভাব ছিল দুর্বল। আবার এই প্রভাব প্রায় রাঢ় অঞ্চলেই সীমিত ছিল। বৌদ্ধধর্মের আগে রাঢ়-বরেন্দ্রে জৈন ধর্ম প্রচারিত হয়। ‘ৃ.জৈন বৌদ্ধ বিরোধ সংঘর্ষ হয়েছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু তার রূপ-স্বরূপ আজ আমাদের সামনে তেমন স্পষ্ট নয়। দিব্যাবদান সূত্রে জানা যায়, অশোক পুন্ড্রবর্ধনে বৌদ্ধ ধর্মের অবমাননায় রুষ্ট হয়ে আঠারো হাজার আজীবিক বা নিগ্রন্থ জৈন হত্যা করেছিলেন।১৯ মনে হয় বৌদ্ধদের বিরূপতায় বাংলাদেশে জৈন সংস্কৃতি উচ্ছেদ হয়।২০

বৌদ্ধ সংস্কৃতি
বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক ছিলেন গৌতম বৌদ্ধ। হিমালয়ের পাদদেশে কপিলাবস্তু নগরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। যশোধরা নাুী এক অনিন্দ্য সুন্দরী মহিলা ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাঁর পুত্রের নাম ছিল রাহুল। কিন্তু সুন্দরী স্ত্রী ও গৃহ সংসারের আরাম আয়েশ তাঁর অস্থির চিত্তকে শান্তি ও নিশ্চিন্ততা দানে সক্ষম হয়নি। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও আর্য দর্শনও তাঁর তৃপ্তি সাধনে সক্ষম হয়নি। অবশেষে একদা গভীর রাতে স্রষ্টার অস্তিত্বের গূঢ় রহস্যের দ্বারোদঘাটনে তিনি সংসারের মায়া ত্যাগ করে গৃহ হতে নিস্ক্রান্ত হন। ছয় বছর কঠোর সাধনার পর চল্লিশ বছর বয়সে তিনি সত্যের সন্ধান লাভ করেন। চল্লিশ বছর অবধি অব্যাহতভাবে সত্যধর্ম প্রচারের পর ৮০ বছর বয়সে (খৃষ্টপূর্ব ৪৮৭ অব্দে) তিনি কুশী নগরে দেহত্যাগ করেন। তাঁর নিজের সমগ্র পরিবার ও গোত্র তার ধর্ম গ্রহণ করে। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর ধর্ম বিপুল সাড়া জাগায়। কিছু কালের মধ্যে তাঁর ধর্ম ভারতের প্রধানতম ধর্মে পরিণত হয়। এশিয়ার বিভিন্ন জাতির কাছেও তা সমাদৃত হয়।

বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা হচ্ছে: অহিংসা, দয়া, দান, সৎচিন্তা, সংযম, সত্যভাষণ, সৎকার্য সাধন, স্রষ্টাতে আত্মসমর্পণ প্রভৃতি মানুষের মুক্তি লাভের প্রধান উপায়। যাগ-যজ্ঞ ও পশু বলী দিয়ে ধর্ম পালন করা যায় না। ধর্ম পালন করতে হলে ষড়রিপুকে বশ করে আত্মাকে নিষ্কলুষ করতে হয়।

বুদ্ধদেব সর্বপ্রথম ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি দার্শনিক মতবাদ এবং নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন। বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের আঘাতে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। বুদ্ধ জন্মগত জাতি প্রথাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনিই ছিলেন হিন্দু ভারতের প্রথম বিপ্লবী সন্তান।২১ বুদ্ধদেবের চিন্তাধারা ছিল নি:সন্দেহে একটি ভাববিপ্লব। আর বুদ্ধের ভাবধারা প্রসূত সমাজ বিন্যাস ছিল এক সামাজিক বিপ্লব। তাদের সমাজের আলোকে তারা একটি সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিল। কিন্তু তাদের সেই বিপ্লব তথা আদর্শ ও সমাজ চেতনা তারা ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। বিভিন্ন প্রকার অবৌদ্ধমত বৌদ্ধ সমাজে অনুপ্রবেশ করে তাদের মধ্যে অবক্ষয় সৃষ্টি করে। এরই সুযোগে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধদের ওপর আদর্শিক, সাংস্কৃতিক এবং দৈহিক আঘাত শুরু করে। পরিণামে ব্রাহ্মণ্যবাদী উৎপীড়ন ও নিষ্ঠুরতায় বৌদ্ধ ধর্মের মত এত প্রকান্ড মহীরূহ উৎপাটিত হলো।২২ জন্মভূমি হতে বৌদ্ধধর্ম নির্বাসিত হলেও ভারতের বাইরে,

পৃথিবীর এক বৃহৎ অংশ জুড়ে- তিব্বত, সিংহল, ব্রহ্মদেশ, থাইল্যান্ড, ইন্দোচীন, ভিয়েতনাম, জাপান, চীন প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধরা এখনো সংখ্যা গরিষ্ঠ হয়ে বসবাস করছে।
পৃষ্ঠা- ৬
মোটকথা, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে একদিকে হিন্দু ধর্মের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল এবং অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচার ও নিপীড়নে গোটা ভারতের জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ধীরে ধীরে দ্রাবিড় অধ্যুষিত বাংলায় এসে আশ্রয় নিচ্ছিল। সপ্তম শতকের পর বৌদ্ধ ধর্মই বাংলায় প্রবল হয়। অষ্টম শতকে বাংলায় পালরাজাগণের অভ্যুদয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এ সময়েই বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের ব্যাপক উন্নতি হয়। প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন চর্যাপদগুলো এসময়েই রচিত হয়। একাদশ শতকের শেষভাগ থেকে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত হিন্দু ধর্ম ও সেন রাজবংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্মের ওপর প্রচন্ড আঘাত আসে। বৌদ্ধরা নিপীড়িত হতে থাকে।২৩

সেন আগমনে বিপর্যস্ত সংস্কৃতি
পালদের পরে বহিরাগত সেনরা এসে এদেশকে নিজেদের অধিকারে রেখেছিল। খুব দীর্ঘকাল না হলেও প্রায় পঁচাত্তর বছর তারা এ অঞ্চল শাসন করেছিল। এখানকার মানুষকে স্বধর্মচ্যুত করবার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল এবং কর্ণাটক ও কর্ণকুঞ্জ থেকে সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ এনে এ অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনবার চেষ্টা করেছে। এরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর আকারে জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তন করে এবং বৌদ্ধদের উৎখাত করার চেষ্টায় সকল শক্তি নিয়োগ করে। এ উৎখাত চেষ্টায় তারা যে কঠোরতার নিদর্শন রেখে গেছে তা বাংলার সংস্কৃতির মধ্যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যে সেন রাজাদের শাসনে রাজ দরবারের গৃহীত নীতি হিসেবে সংস্কৃত উচ্চবিত্তদের আসরে স্থান লাভ করে। রাজ দরবারে সংস্কৃত ভাষার কবি, সঙ্গীতজ্ঞ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্থান হয় এবং রাজ আনুকূল্যে একটি হিন্দু সংস্কৃতি এ দেশের ওপর আরোপিত হয়।২৪

হিন্দু সংস্কৃতি
বর্ম ও সেন রাজাগণ ছিলেন বৈষ্ণব ও শৈব ধর্মাবলম্বী। এরাই বাংলায় মূর্তি পূজার প্রচলন করেন। ধর্মের নামে সতীদাহের ন্যায় গর্হিত প্রথার প্রচলন এখানে ছিল। বাংলায় বৈদিক রীতিতে পূজা পাঠ করার জন্য বর্ম ও সেন রাজাগণ বৈদিক ব্রাহ্মণ আমদানি করেন। বাংলায় কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তনও তাঁদের একটি কীর্তি। জাতিভেদ ও বর্ণাশ্রম প্রথাকে তাঁরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। রাজশক্তির প্রচন্ড দাপটে হিন্দু সংস্কৃতির অগ্রাভিযান চললেও সাধারণ ধনী ও উচ্চ শ্রেণীর মধ্যেই হিন্দু সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ ছিল। এবং জনসাধারণের অধিকাংশই বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনুসারী ছিল।২৫

সার কথা হলো খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ পর্যন্ত বাংলার অনার্য অধিবাসীরা আর্যদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব প্রতিহত করে আসছিল। কিন্তু খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষের দিকে (৩২৩ খৃ. পূ.) পাটলিপুত্রে নন্দরাজ বংশের পতন ও শক্তিশালী মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলায় আর্যদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। খৃস্টীয় চতুর্থ শতকের শেষ অবধি গুপ্ত রাজ বংশের অধিকার পর্যন্ত ৮০০ বছরের মধ্যে বাংলায় আর্যদের পরিপূর্ণ প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এ প্রভাব সর্বগ্রাসী রূপ নেয়। দ্রাবিড় ও অনার্য শক্তি স্তিমিত হবার সাথে সাথে আর্য ও হিন্দু সংস্কৃতি দ্রুতবেগে অগ্রসর হতে থাকে। সংক্ষেপে এই হলো প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক চিত্র।

মুসলিম সংস্কৃতি
অত:পর শুরু হলো মধ্যযুগ। প্রাচীনকালের অবসান ও মধ্যযুগের শুরু ইসলাম আবির্ভাব সংশ্লিষ্ট। হযরত মুহাম্মাদ (সা:) ছিলেন শেষ নবী। তাওহীদবাদী সভ্যতা-সংস্কৃতির শেষ শিক্ষক ও সত্য দ্বীন ইসলামের সর্বশেষ প্রচারক। নবুওয়াত লাভ করার পর দীর্ঘ ২৩ বছরের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও সাধনায় একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বমানবতার রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের সুষ্ঠ পরিচালনার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহর নির্দেশিত পথে মানুষকে পরিচালনা করাই ছিল তাঁর দায়িত্ব। নিজের জীবদ্দশায় এ দায়িত্ব তিনি পুরোপুরি পালন করে যান। তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর সুশিক্ষিত সাহাবীগণের কাছ থেকে সত্যের আলোকে উদ্দীপ্ত তাবিয়ীগণ, তাবিয়ীগণের কাছে দীক্ষাপ্রাপ্ত তাবা-তাবিয়ীগণ এবং এভাবে পর্যায়ক্রমে মুসলমানদের বিভিন্ন দল ইসলামের সত্যবাণী ও তাওহীদভিত্তিক সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থার কাঠামো নিয়ে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন।

পৃষ্ঠা- ৭
মুসলমানদের এ উপমহাদেশে আগমন দু’টি ধারায় বিভক্ত। আগমনকারীদের একটি ধারা ছিল সমুদ্র পথ ধরে। আর অন্য ধারাটি ছিল স্থলপথে। যারা সমুদ্রপথ অনুসারী তাঁরা প্রধানত বাণিজ্যিক মকসূদ নিয়ে আসতো। প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে তাদের এ অঞ্চলে আনাগোনা ছিল। তাঁদের সাথে বহু দরবেশ-আওলিয়া উপমহাদেশে আগমন করেন। এই সমুদ্র পথযাত্রীরা মূলত ছিল আরব। তাঁদের চরিত্র-মাহাত্ন্য স্থানীয় লোকদের বিমুগ্ধ করে। তাঁরা কেবল তিজারতী করেননি সঙ্গে সঙ্গে একটি মতবাদও প্রচার করেন। এবং তাঁরা একটি বিশেষ আকর্ষণীয় মূল্যবোধ সমন্বিত ছিলেন। তাঁরা একটি অনুকরণীয় সংস্কৃতিরও পা’বন্দ ছিলেন।

ইসলামই ছিল এ সংস্কৃতির নিয়ামক শক্তি। আর স্থলপথে যারা এসেছিলেন তাঁরা মুখ্যত ছিলেন যোদ্ধা। রাজ্য জয় তাঁদের লক্ষ্য ছিল। তবে তাঁরা যেহেতু ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন- তাই ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিই ছিল তাঁদের প্রধান নৈতিক হাতিয়ার। তাঁদের সংস্কৃতি হলো ইরানী সংস্কৃতি যা নির্মিত হয়েছিল ইরান ও আরব উপাদানে। ইসলাম ছিল এ সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রক।২৬ ইসলাম মানুষের মন-মানষিকা ও চিন্তা ধারায় আমূল পরিবর্তন সূচনা করে। তাই ইসলাম ভাব-বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল বলা যায়। বর্ণপ্রথা তথা বর্ণ বিদ্বিষ্ট সমাজে মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন সমাজ প্রতিষ্ঠাও এদেশের মানুষের নিকট ছিল এক নব আবিস্কার। বৌদ্ধ ধর্ম বিলুপ্তির পর জনগণ বর্ণভেদহীন সমাজ বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। স্তরবিহীন সমাজ এদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার অতীত হয়ে পড়েছিল। ইসলামের সমাজ বিন্যাস তাদের নিকট ছিল সম্পুর্ণ নতুনত্বে বৈশিষ্ট্যময়। যদিও খাঁটি ইসলামী সমাজ সংস্কৃতি এখানে কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তথাপি যেটুকু হয়েছিল তাও ব্রাহ্মণ্য সমাজ ও সংস্কৃতি হতে বেহতের ছিল। সে জন্যই বলা হয় ইসলাম এক নতুন যুগের স্রষ্টা। এ যুগটাই হলো বাংলার মধ্যযুগ। ইসলামের মোকাবিলায় প্রাচীন যুগের ইতি রচিত হলো। তবে মধ্যযুগ সমগ্র উপমহাদেশে একসঙ্গে দেখা দেয়নি। কারণ মুসলমানেরা ইসলামের বাণী একই সময় উপমহাদেশের এক প্রান্ত হতে অন্যপ্রান্তে বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি।

ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেন, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী যে সময় বঙ্গ বিজয় (১২০১ খৃ:) করেন, তার অনেক কাল আগে অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দীর গোড়াতে আরব বণিকগণ বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ও ঢাকা বিভাগের সমুদ্র কুলবর্তী অঞ্চলে ইসলামের বাণী বহন করে আনেন। খৃষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দী থেকে চট্টগ্রাম বন্দর আরব বণিকদের উপনিবেশে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে চট্টগ্রাম ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে আরব ব্যবসায়ীদের প্রভাব প্রতিপত্তির ফলে যখন স্থানীয় লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলাম এদেশের বহু অঞ্চলে স¤প্রসারিত হয়, তখন আরব ও মধ্য এশিয়ার বহু পীর, দরবেশ ও সূফী-সাধক ইসলাম প্রচারের জন্য স্বদেশ ত্যাগ করে পূর্ব বঙ্গের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।২৭

বাংলাদেশের সঙ্গে মুসলিম আরবগণের যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় তার প্রাচীনতম ঐতিহাসিক নিদর্শন বিখ্যাত আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদ (৭৮৬-৮০৯ খৃ:) এর খিলাফতকালের একটি আরবী মুদ্রা। মুদ্রাটি রাজশাহী জেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের (প্রকৃত নাম- সোমপুর বিহার) ধ্বংসস্তুপের ভেতর আবিস্কৃত হয়েছে। আল-মুহাম্মদীয়া টাকশালে ৭৮৮ খৃ: (১৭২ হি.) এই মুদ্রাটি মুদ্রিত হয়। আবার স¤প্রতি কুড়িগ্রাম জেলায় এমন একটি মসজিদ আবিস্কৃত হয়েছে যা সপ্তম শতাব্দীতে (৬৮৯ খৃ:) তৈরি করা হয়েছিল। এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, এদেশে মুসলমানগণ আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করার জন্য মসজিদ তৈরি করতেন।২৮ উল্লেখ্য যে, আরব বণিকগণ চট্টগ্রাম অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে বাণিজ্যের সঙ্গে ইসলাম প্রচারেও মনোনিবেশ করেন এবং ইসলামে দীক্ষিত করে স্থানীয় রমণীদের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন।২৯

মশহুর সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন- ‘‘বাংলাদেশে ইসলামের প্রথম আবির্ভাব হয় পশ্চিম ভারতের স্থলপথ দিয়া নয়, দক্ষিণ দিক দিয়া জলপথে। চাটগাঁ বন্দর হইয়াই ইসলাম বাংলায় প্রবেশ করে সর্বপ্রথম। এই হিসাবে বাংলার কৃষ্টিক পটভূমি রচনায় চাটগাঁ বন্দরের ভূমিকা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। এই সম্পর্কে দুইটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের কথা আমাদের স্মরণ রাখা দরকার। বাংলায় মুসলিম রাষ্ট্রশক্তি প্রবেশ করে পশ্চিম সীমান্ত পথে, উত্তর ভারত হইতে। পক্ষান্তরে বাংলায় ইসলাম প্রবেশ করে দক্ষিণ দিক হইতে চাটগাঁ বন্দর দিয়া। বাংলায় মুসলিম রাষ্ট্রশক্তির রূপ তুর্কী, পাঠান ও মোগলাইরূপ। পক্ষান্তরে ইসলাম ধর্মীয়রূপ খাঁটি আরবীরূপ।

উপমহাদেশের অপরাপর অঞ্চলের মুসলমানদের তুলনায় বাঙালী মুসলমানদের আড়ম্বরহীন অপ্রদর্শনবাদী, সতেজ ধর্মীয় চেতনাই বাঙালী মুসলমানদের এই ধর্মীয় বৈশিষ্টের স্বাক্ষর বহন করিতেছে। বাঙালী মুসলিম জনসাধারণের কথ্যভাষায়, মুখের জবানে ফার্সী, উর্দুর চেয়ে আরবী শব্দের প্রাচুর্য দেখা যায় বেশী।ৃৃৃৃ.পূর্বে আরাকান,
পৃষ্ঠা- ৮
উত্তরে ত্রিপুরা ও পশ্চিমে বাকেরগঞ্জ ধরিয়া বিচার করিলে দেখা যাইবে চাটগাঁই এসব কৃষ্টি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি ছিলো। ৃৃৃৃৃ. আধুনিক আলোচনাতেও দেখা যাইবে যে, বাংলার কৃষ্টি-সাহিত্যের ব্যাপারে চাটগাঁয়ের অবদানের তুলনা নাই। এই বিষয়ে চাটগাঁ-ই পাক-বাংলার পটভূমি।৩০

গৌড়বঙ্গের রাজা লক্ষণ সেন ছিলেন হিন্দু। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ প্রজা ছিলো বৌদ্ধ। বৌদ্ধ প্রজারা হিন্দু রাজার অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে তুর্কীগণের আগমন প্রতীক্ষা করছিল। এমনি এক শুভ মুহূর্তে (১২০১ খৃ.) বখতিয়ার খলজী বঙ্গ জয় করেন। বখতিয়ার খলজী একটি নতুন বিশ্বাস ও চৈতন্য বঙ্গ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। এদেশে মুসলমানগণ এসেছে বহু পূর্বেই। কিন্তু তখন তাঁরা কোন রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেনি। বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ বিজয়ের (ত্রয়োদশ শতকে) মাধ্যমে এই প্রথম বারের মতো তাঁরা রাষ্ট্রশক্তির সহযোগিতা লাভ করেন। ফলে ইসলাম প্রচারের ধারা বন্যার বেগে এগিয়ে চলে। এ সময়ে আরব, পারস্য, তুর্কী, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও পাক-ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ওলী, সূফী-দরবেশ ও আলিম প্রভৃতি ইসলাম প্রচারক ছাড়াও বহু মুসলিম এদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসাবাস করতে থাকেন এবং নানা স্তরের রাজপদে ও সৈন্য বিভাগে নিযুক্ত হন। এভাবে বহু বিদেশী মুসলিম এদেশে এসে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান এবং তাঁরাও দেশীয় হিন্দু, বৌদ্ধ, অনার্য ও পার্বত্য উপজাতিদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। এক দিকে ইসলামী ন্যায় বিচার ও সুশাসন, অন্যদিকে বিদেশ থেকে আগত মুসলিমদের উন্নত চরিত্র, শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সাম্য অত্যাচারিত অমুসলিমগণকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। এ সময়ে এ দেশের বিপুল পরিমাণে হিন্দু ও বৌদ্ধগণ ইসলাম গ্রহণ করেন।

এত বিপুল সংখ্যক হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণের পেছনে এদেশীয় রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাও কমদায়ী ছিলোনা। মুসলিম বিজয়ের পূর্বে সেন বংশীয় হিন্দু রাজাদের রাজত্বকালে ধর্ম-কলহ ও সা¤প্রদায়িক ভেদ-বৈষম্য এদেশের সমাজ জীবনকে শতধাবিচ্ছিন্ন করে জাতীয় জীবনকে করেছিল পঙ্গু। হিন্দু রাজারা বৌদ্ধদের প্রতি শুধু জুলুম-অত্যাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি। বৌদ্ধদেরকে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা মনে করতো অশুচি। তারা তখন বৌদ্ধদের অস্তিত্ব লোপ করতে বদ্ধ পরিকর। তান্ত্রিকতাবাদের প্রভাবে বৌদ্ধ ও নাথ পন্থীগণের সামাজিক ও নৈতিক জীবন তখন অতি নিুস্তরে। ব্রাহ্মণ্যবাদের নিশপেষণে নিুবর্ণের হিন্দু সমাজ ছিল জীবনমৃত। জাতীভেদ, বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক ভেদ-বুুদ্ধি সবকিছু মিলে এদেশের সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনকে করেছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খন্ডে বিভক্ত, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসী, বিদ্বিষ্ট। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির উৎস তেত্রিশ কোটি কল্পিত দেবতা ও ভূত-প্রেত সম্বন্বীয় সহস্র রকমের কুসংস্কারে তারা ছিলো আচ্ছন্ন, ধর্ম-জীবন-দর্শন ও সংস্কৃতির বিকৃত ব্যাখ্যার গোলক ধাঁধাঁয় তারা হয়েছিলো আত্নকেন্দ্রিক, বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন, নিয়তির দাস, ভাগ্য-নির্ভর ও উদ্যামহীন। এদেশের সাধারণ সমাজ ব্রাক্ষণ্যবাদের স্বার্থসর্বস্ব জীবন-দর্শনকে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। কৌলিন্য প্রথা ও অস্পৃশ্যতার গ্লানি সমাজের নিুতর স্তরের অবহেলিত জনগণকে সর্বদাই পীড়া দিয়েছে। এরূপ পরিস্থিতিতে যখন তারা ইসলামের ধর্মনীতি ও জীবন দর্শণে দেখল সহজ সরল ধর্ম বিশ্বাস, অনাড়ম্বর উন্নত জীবন যাপন ও সদাচরণ এবং বিদেশাগত সূফী সাধক, আলীম ও মুসলিম প্রচারক ও বণিক প্রমুখের জীবনে তা রূপায়িত হতে দেখতে পেল, তখন স্বাভাবিক ভাবেই তারা তাতে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।৩২

এভাবে মুসলমানদের এ অঞ্চলে আগমনের ফলে সাংস্কৃতিক জীবনে নতুন মাত্রা সংযোজিত হলো। একটি নতুন স্থাপত্য রীতি এদেশে গড়ে ওঠলো যা দৃশ্যত শোভন এবং ব্যবহার উপযোগীতার আদর্শস্থল। সারা দেশে অসংখ্য মসজিদ নির্মিত হতে লাগল এবং মসজিদের গঠন প্রণালী একটি নতুন স্থাপত্য রীতির প্রবর্তন করলো। মুসলমানেরা বঙ্গ ভূখন্ড দখল করবার পর এ অঞ্চলের সংস্কৃতির বিপুল পরিবর্তন ঘটে। সেন আমলে সংস্কৃত ভাষার যে প্রভাব ছিলো সেই প্রভাব দূরীভূত হয় এবং তার পরিবর্তে আরবী ও ফার্সী ভাষার প্রভাব আমরা লক্ষ করি। এবং ভাষা শিক্ষার জন্য মাদরাসা স্থাপিত হয়। আর ধর্ম সাধনা ও ইবাদতের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় অসংখ্য খানকাহ ও মসজিদ। তখন মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাই ছিলো ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। বখতিয়ার খলজীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি হচ্ছে নতুন নতুন নগর নির্মাণ। এভাবে নগর নির্মাণের সাহায্যে একদিকে যেমন নতুন সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছিলেন অন্যদিকে তেমনি এ দেশীয় গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারার মধ্যে পরিবর্তন এনেছিলেন। সেন আমলে জাতিভেদ প্রথার প্রভাবে নিু বর্ণের সাধারণ মানুষরা খুবই উৎপীড়িত ছিল। মুসলমান আগমনের ফলে এ উৎপীড়ন বন্ধ হবার সুযোগ ঘটে এবং সমাজে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ অসমর্থিত হতে থাকে। বখতিয়ার খলজীর আগমনকে নিুবর্ণের হিন্দুরা স্বাগত জানিয়েছিল কতকগুলো কারণে। প্রথমত সেনরা ছিলো বাহিরাগত এবং তারা বহিরাগত ব্রাহ্মণ এনে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার বিঘ্ন ঘটায়। দ্বিতীয়ত দেশী মাতৃভাষার সাহিত্য চর্চার বিরুদ্ধে এদের কঠোর নির্দেশ ছিলো। নরকে নিক্ষিপ্ত

পৃষ্ঠা- ৯
হবার ভয় দেখিয়ে দেশী ভাষার চর্চা থেকে এরা মানুষকে বিরত রাখবার চেষ্টা করে। তৃতীয়ত: দরবারের ভাষা হিসেবে
সংস্কৃত ভাষা প্রতিষ্ঠা পায় এবং এর ফলে সংস্কৃতির একটি উচ্চমার্গ জন্ম লাভ করে, যার সঙ্গে নিুবিত্ত মানুষদের সংস্কৃতির কোন যোগাযোগ ছিলো না। চতুর্থত : নগরের যে পরিকল্পনা সেনদের ছিল, সে নগর ছিল সীমাবদ্ধ এবং সংকীর্ণ। নিু বিত্তদের বাসস্থান ছিল নগরের বাইরে, অর্থাৎ নগর ছিল ব্রাহ্মণদের জন্য। এভাবে সাধারণ মানুষকে দেশের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার যে প্রবণতা গড়ে ওঠে সে প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই সাধারণ মানুষ বখতিয়ার খলজির আগমনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ এ অঞ্চেলের সংস্কৃতি বখতিয়ারের আগমনের পর একটি নতুন রূপব্যঞ্জনা লাভ করে।

মুসলমানদের শাসন আমলে এদেশে সংস্কৃতির নতুন দ্বার উন্মোচিত হয় এবং পাল আমলের মত নতুন করে মাতৃভাষার চর্চা চলতে থাকে। পালদের ধর্মীয় ভাষা ছিলো পালী। ধর্মীয় অনুশাসন এবং ধর্মগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে পালি ভাষা ব্যবহার করলেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে তারা লোকভাষা ব্যবহার করেছিলেন। তেমনি মুঘল শাসনামলে ধর্মীয় ভাষা আরবী এবং দরবারের ভাষা ফার্সী হওয়া সত্বেও সাহিত্যের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার চর্চায় মুসলমান রাজন্যবর্গ উৎসাহ প্রদান করেছেন। এই সময়কালেই বাংলাভাষার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আরবী,ফার্সী ও তুর্কী শব্দ প্রবেশ করতে থাকে। এভাবে দু’হাজারের অধিক আরবী, ফার্সী ও তুর্কী শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করে।৩৩

আসলে বাংলা ভাষার প্রকৃত চর্চা মুসলমান আমলেই শুরু। প্রথম দিকের লেখক ছিলেন প্রায় সকলেই হিন্দু। তাঁরা আর্য প্রভাবান্বিত ছিলেন। সংস্কৃত অনুসারী হয়ে তাঁরা কাব্য রচনা করেন। সে জন্য তাঁদের রচিত কাব্য সংস্কৃত শব্দ বহুল ছিল। কিন্তু তাদের এসব রচনা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিলনা। অবশ্য হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিু শ্রেণীর জনগণের জন্য লেখা পড়া ছিল নিষিদ্ধ। সুতরাং বর্ণ হিন্দুদের কোন রচনায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য শব্দ ব্যবহৃত হলো কিনা সে সম্পর্কে কোন ধারণা চিন্তা লেখকের থাকবার কথা নয়। তাই এসব হিন্দু লেখকেরা সংস্কৃতায়িত শব্দ ও হিন্দু শাস্ত্র কেন্দ্রিক এক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ধারা প্রবর্তন করেন। পরে মুসলিম ধারা ক্রমে ক্রমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পনের শতকের শেষ পদের কবি বিপ্রদাস পিপলাই ‘মনসা বিজয়’ কাব্য রচনা করেন। তার এই পুস্তকে আরবী ফার্সী শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম ১৫৮৯ সালে তার ‘চন্ডীমঙ্গল’ রচনা করেন। তিনিও আরবী ফার্সী শব্দ ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে আরবী ফার্সী শব্দ সম্বলিত সাহিত্যই বাংলায় প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। এবং আরবী ফার্সী শব্দই বাংলা ভাষার বিরাট অঙ্গন দখল করে।৩৪

বাংলায় মুসলিম আগমনের ফলে এভাবে সামাজিক রীতিনীতি, ব্যবহার,পদ্ধতি ও সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। বিশেষ করে বাংলা ভাষার পরিবর্তন ঘটে এবং বাংলা ভাষার বর্ণিত জীবন কাহিনীর মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ এবং জীবন চেতনার স্বাক্ষর ধরা পড়ে। পৃষ্ঠা- ১০

তথ্য নির্দেশিকা
১. আবদুল মান্নান তালিব, বাংলাদেশে ইসলাম, ইফাবা, ঢাকা, ২য়সং, ২০০২, পৃ. ২২
২. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৩
৩. প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৩-২৪
৪. আসাদ বিন হাফিজ, ইসলাম সংস্কৃতি, প্রীতি প্রকাশন, ঢাকা ১৯৯৪, পৃ. ১০
৫. প্রাগুপ্ত,
৬. প্রাগুপ্ত, পৃ. ১১
৭. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৬
৮. মোহাম্মদ সোলায়মান, প্রসংগ সংস্কৃতি, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, ১ম সং, ১৯৯০, পৃ. ১০২-১০৩
৯. নীহার রঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১ম সং, ১৪০০, পৃ. ৫০
১০. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৭
১১. প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৭-২৮
১২. প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৮
১৩. দেবী প্রসাদ চট্ট্রোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, তা: বি: পৃ. ৬৯
১৪. প্রাগুপ্ত,
১৫. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ৩০
১৬. আসাদ বিন হাফিজ, প্রাগুপ্ত, পৃ. ১১
১৭. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ৩১
১৮. প্রাগুপ্ত, পৃ. ৪৬-৪৭
১৯. ড. আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, ১ম সং, ১৯৭৭, পৃ. ৭৭
২০. ড. আহমদ শরীফ, বাঙালীর চিন্তা-চেতনার বিবর্তন ধারা, তা: বি. পৃ. ৪১
২১. খাজিম আহমদ, ইতিহাস চর্চা ও সা¤প্রদায়িকতা, চতুরঙ্গ, কলকাতা, মার্চ, ১৯৮৮ সংখ্যা, পৃ. ৯৮১
২২. মোহাম্মদ সোলায়মান, প্রাগুক্ত পৃ. ১০৬-১০৭
২৩. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১
২৪. আসাদ বিন হাফিজ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪-১৫
২৫. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১
২৬. মোহাম্মদ সোলায়মান, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১
২৭. ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম, ঢাকা পুনর্মুদ্রণ, ১৯৮৪, পৃ. ১৬-২০
২৮. ড. গোলাম সাকলায়েন, বাংলাদেশের সুফী-সাধক, ইফাবা, ঢাকা, ৪র্থ সং, ২০০৩, পৃ. ১৯
২৯. শইখ শরফুদ্দীন, অধ্যক্ষ, বাংলাদেশে সুফী-প্রভাব ও ইসলাম প্রচার, আদর্শ মুদ্রায়ণ, ঢাকা, ১ম সং, ১৯৮২, পৃ. ৩
৩০. আবুল মনসুর আহমদ,বাংলাদেশের কৃষ্টিক পটভূমি,দৈনিকসংগ্রাম,বৃহস্পতিবার ও বৈশাখ,১৩৯৫ বাংলা সংখ্যায় মুদ্রিত,পৃ,৯
৩১. এবন গোলাম সামাদ,ডক্টর ,বাংলাদেশে ইসলাম,ইফাবা,ঢাকা,১৯৮৭,পৃ.৭
৩২. শইখ শরফুরদ্দীন,প্রাগুপ্ত, পৃ.৯-১০
৩৩. আসাদ বিন হাফিজ,প্রাগুপ্ত,পৃ১৫-১৬
৩৪. মোহাম্মদ সোলায়মান,প্রাগুপ্ত,পৃ.১১৮

সংস্কৃতি মানুষের জীবনের একটি বিকশিত ও পরিশীলিত রূপ। জীবন ধারার কাঠামো, বিস্তৃতি ও রূপ বৈচিত্রের বাইরে সংস্কৃতি কোনো ভিন্নরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারেনা। দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বছর থেকে এ ধারাই অব্যাহত আছে। সংস্কৃতি যদি অপরিবর্তনীয় হতো তা হলে গোটা দুনিয়া জুড়ে মানব জাতির সংস্কৃতি হতো এক ও অভিন্ন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভিন্ন সংস্কৃতির বিকাশ দেখা গেছে। এগুলো সবই মানুষের বিভিন্ন জীবন ধারা ও জীবন চর্চার ফল। জীবন চিন্তা ও জীবন দর্শনের ভিত্তিতে সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটেছে এবং তা বিভিন্ন রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানে কালের পরিক্রমায় ভিন্ন ভিন্ন জাতির আগমন ঘটেছে। এবং তাঁরা তাঁদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও আদর্শের ভিত্তিতে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন সভ্যতা ও সংস্কৃতি। ইসলামী-জীবন চর্চাই ইসলামী সংস্কৃতি। মুসলমানরা যেভাবে তাদের জীবন গড়ে তোলে ইসলামী সংস্কৃতি ঠিক তেমনি রূপ লাভ করে। মুসলিম সমাজ ছাড়া ইসলামী-সংস্কৃতি বিকশিত হতে পারেনা। তাই এই জনপদে ইসলামের আগমন এবং মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরাই এই নিবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। তবে বিষয়টিকে সুস্পষ্ট করে তোলার জন্য প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক পটভূমি আলোচনা করা প্রয়োজন। সংগত কারণেই নিবন্ধটিকে তিনটি পর্বে (প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ) বিভক্ত করে আলোচনা করা হলো।

প্রাচীন বাংলার সীমানা
প্রাচীন বাংলার সীমানা নির্ধারণ মোটেই সহজ কাজ নয়। কারণ আজকের যুগে বাংলা বলতে আমরা যে সব এলাকাকে বুঝি প্রাচীন যুগে সে সব এলাকার কোন একটিমাত্র নাম ছিল না। এ সব এলাকার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন নামে আখ্যায়িত হতো। এ সব এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ছিল একাধিক স্বাধীন রাজ্য। তবে মোটামুটিভাবে আমরা প্রাচীন বাংলার সীমা নির্দেশ এভাবে করতে পারি: উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে গারো, খাসিয়া, লুসাই, জয়ন্তিয়া, ত্রিপুরা ও চট্টগ্রামের শৈল শ্রেণী এবং পশ্চিমে বিহারের রাজমহল পাহাড় ও কলিঙ্গ, এ চতু:সীমার মধ্যবর্তী অঞ্চলই সাধারণত বাংলা নামে পরিচিত।১

খৃষ্টীয় সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক সর্বপ্রথম বাংলার এ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত জনপদগুলোকে একত্র করার চেষ্টা করেন। শশাঙ্কের পরে বাংলা গৌড়, পুন্ড্র ও বঙ্গ এ তিনভাগে বিভক্ত ছিল। মুসলমান শাসন আমলেই এ বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্র করার চেষ্টা সফলকাম হয়। বাংলায় পাঠান যুগের পূর্ব থেকে পশ্চিমবঙ্গ ‘গৌড়’ ও পূর্ববঙ্গ ‘বঙ্গ’ এ দু’নামে চিহ্নিত হতো। ষোড়শ শতকে মোগল শাসন আমল থেকে এ সমগ্র এলাকা ‘বাঙ্গালা’ নামে অভিহিত হয়েছে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজুদ্দৌলার আমলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা একত্রে ছিল বাংলাদেশ। ইংরেজ শাসনামলে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পূর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হিসেবে পূর্ববঙ্গ ও আসাম স্বতন্ত্র প্রদেশের মর্যাদা পায়। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও বাংলাদেশ তার পূর্ববর্তী সীমানা ফিরে পায়নি। তখন বিহার ও উড়িষ্যা পৃথক প্রদেশের মর্যাদা লাভ করে। নতুন ব্যবস্থায় পূর্ববঙ্গ, দার্জিলিং ও পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে বাংলাদেশ গঠিত হয়। আসাম পৃথক প্রদেশের মর্যাদা লাভ করে। ফলে একদিকে বাংলাভাষী সিলেট, কাছাড়, শিলচর ও গোয়ালপাড়া জেলা আসামে থেকে যায় এবং অন্যদিকে পূর্ণিয়া, মানভূম, সিংভূম ও সাঁওতাল পরগণা প্রভৃতি বাংলাভাষী জেলাগুলো বিহারের অন্তর্ভুক্ত থাকে। ১৯৪৭ সালে আসামের সিলেটসহ পূর্ববঙ্গ পূর্বপাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে এ পূর্ব পাকিস্তানই স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়। খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খৃষ্টীয় দ্বিতীয় শতক অবধি লিখিত গ্রীক ঐতিহাসিক ও ভূগোলবিদ-এর বর্ণনা অনুযায়ী গঙ্গার সর্বপশ্চিম ও সর্বপূর্ব দু’ধারার মধ্যবর্তী ব-দ্বীপ

পৃষ্ঠা- ২
অঞ্চলই আসল বঙ্গ। এবং এর প্রায় সবটুকুই (২৪ পরগণা, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া জেলার অংশবিশেষ ছাড়া) বর্তমান
বাংলাদেশের অন্তর্ভূক্ত।২

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, বাংলার সমগ্র জনপদ বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। এগুলোকে একত্রে ‘বাংলা’ নামকরণ মাত্র কয়েকশ বছর আগের ঘটনা। মুসলমান শাসনামলেই সর্বপ্রথম এ সমগ্র এলাকাকে বাংলা বা বাঙ্গালা নামে অভিহিত করা হয়। সম্রাট আকবরের শাসনামলে সমগ্র বাংলাদেশ সুবা-ই- বাঙ্গালাহ্ নামে পরিচিত হয়। ফার্সী বাঙ্গালাহ্ থেকে পর্তুগীজ ইবহমধষধ বা ঢ়বহমধষধ এবং ইংরেজী ইবহমধষ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। বাংলা নামকরণ সম্পর্কে আবুল ফজল তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে বলেছেন- এদেশের প্রাচীন নাম বঙ্গ এবং এদেশের লোকেরা জমিতে উঁচু উঁচু ‘আল’ বেঁধে বন্যার পানি থেকে জমি রক্ষা করতো। সময়ের ব্যবধানে ‘আল’ শব্দটি দেশের নামের সাথে যুক্ত হয়ে যায়। এভাবে (বঙ্গ+আল) বঙ্গাল শব্দের উৎপত্তি হয়।৩

আমাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
ভূতাত্তিক এবং নৃতাত্ত্বিক গবেষণার ফল থেকে জানা যায়, খৃষ্ট জন্মের বহু আগেই সুমের (খুব সম্ভব বর্তমান মিসর) দেশে এক প্লাবন হয়। সম্ভবত মানব সভ্যতার আদি কেন্দ্র এই সুমের দেশ। কি করে এ ব্যাপক বন্যার ছোবল থেকে সেদিন তারা রক্ষা পেয়েছিল এ প্রশ্নটা ঐতিহাসিকদের ভাবিয়ে তোলে। এর জবাব পাওয়া গেল মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে। কুরআন মাজীদ একে হযরত নূহ (আ) এর মহাপ্লাবন বলে অভিহিত করেছে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের মতে তাওহীদে বিশ্বাসীরা সেদিন নূহ (আ) এর জাহাজে চড়ে আত্মরক্ষা করেছিল। ঐতিহাসিকরা এ সত্যটা স্বীকার করে নিয়ে একে কুরআন ও বাইবেলে বর্ণিত মহা প্লাবন বলে উল্লেখ করেছেন।৪

প্রাচীন মৃৎচাকতিতে এ মহাপ্লাবনের বিবরণ লিপিবদ্ধ দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমান শতকের তৃতীয় দশকে মেসোপটিমিয়ায় আবিস্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে দেখা যায়, এ মহাপ্লাবন আটফুট পুরো পলি মাটির স্তর সৃষ্টি করে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা মতে, এ মহাপ্লাবনের ফলে পলি স্তরটির নীচের ও ওপরের স্থানীয় সংস্কৃতির মধ্যে একটি পূর্ণচ্ছেদ দেখা যায়। বুঝা যায়, তাতে প্রাক প্লাবন কালের সংস্কৃতি জলমগ্ন হয়ে সম্পুর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে এবং সেখানে প্লাবনোত্তরকালের একটি নতুন সংস্কৃতি আবিস্কৃত হয়েছে।৫

ঐতিহাসিকদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই বলা যায়, এ সংস্কৃতি হযরত নূহ (আ:)-এর গড়া সংস্কৃতি। প্লাবনের পরে তারাই পত্তন করলেন আজকের মানব গোষ্ঠীর। নূহ (আ:) এর এক পুত্রের নাম ছিল সাম। মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম সেমেটিক সভ্যতা গড়ে উঠেছে তার নামানুসারেই। সামের পৌত্র আবিরের পিতার নাম আরফাখশাজ। আবিরের পুত্র য়্যাকতীনের ঘরে জন্ম নেয় আবু ফীর। এই আবূ ফীর সভ্যতার গোড়া পত্তন করতে প্রথমে এলেন সিন্ধু এবং তারপর আরেকটু এগিয়ে গংগার তীরে। যে সমৃদ্ধ সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর বহিরাগত আর্য সভ্যতার বিস্তার ঘটেছে ইতিহাস তাকে আখ্যায়িত করেছে দ্রাবিড় সভ্যতা বলে। দ্রাবিড় সভ্যতার গোড়াপত্তনকারী আবু ফীর হযরত নূহ (আ:) এর সপ্তম স্তরের পুরুষ। আরবী ভাষায় যাকে বলা হয় দ্বার। আবু ফীর ও তার বংশধরদের আবাসস্থল কালক্রমে ‘দ্বার আবু ফীর’ বা দ্রাবিড়ে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে ইতিহাসে এরা দ্রাবিড় জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দার মর্যাদা পায়। পৃথিবীর এ ভূখন্ডে মানব সভ্যতার গোড়াপত্তন তাদের অক্ষয় কীর্তি। হরপ্পা ও মোহঞ্জোদারোর যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির নিদর্শন পাওয়া যায় দ্রাবিড়রাই তার নির্মাতা।৬

সুতরাং এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সম্বন্ধে নি:সন্দেহে বলা যায় যে, বাংলাদেশ এক গৌরবময় সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অত্যন্ত উন্নত ও সম্মানজনক। যে ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত ও সৌভাগ্যবান ভাবা যায়; যে ঐত্যিহের কথা স্মরণ করে সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বের লজ্জাজনক পরিবেশকে উপেক্ষা করে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়।

বাংলার আদিম অধিবাসী কারা এ নিয়ে মতভেদের অন্ত নেই। প্রাচীনকালে এদেশের সবটুকু সমুদ্র গর্ভ থেকে উত্থিত না হলেও এখানে প্রাগৈতিহাসিক যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। তাই পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বেও এখানে মনুষ্য বসতি ছিল বলে অনুমান করা হয়। অতি প্রাচীন কালে এখানে আর্যদের আগমনের পূর্বে অন্ততপক্ষে আরো চারটি জাতির নামোল্লেখ করা হয়। এ চারটি জাতি হচ্ছে: নেগ্রিটো, অস্ট্রো-এশিয়াটিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনীয়।
নিগ্রোদের ন্যায় দেহ গঠন যুক্ত এক আদিম জাতির এদেশে বসবাসের কথা অনুমান করা হয়। কালের বিবর্তনে বর্তমানে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিস্ত বিলুপ্ত। প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার বছর পূর্বে ইন্দোচীন থেকে আসাম হয়ে অষ্ট্রো-এশিয়াটিক
পৃষ্ঠা- ৩
বা অস্ট্রিক জাতি বাংলায় প্রবেশ করে নেগ্রিটোদের উৎখাত করে বলে ধারণা করা হয়। এরাই কোল, ভীল, সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি উপজাতির পূর্ব-পুরুষ রূপে চিহ্নিত। বাংলা ভাষার শব্দে ও বাংলার সংস্কৃতিতে এদের প্রভাব রয়েছে। অস্ট্রো-এশিয়াটিক জাতির সমকালে বা এদের কিছু পরে প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে দ্রাবিড় জাতি এদেশে আসে। উন্নততর সভ্যতার ধারক হবার কারণে তারা অস্ট্রো-এশিয়াটিক জাতিকে গ্রাস করে ফেলে। অস্ট্রো-দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণেই আর্য পূর্ব-জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রাক আর্য জনগোষ্ঠীই বাঙ্গালী জনসাধারণের তিন-চতুর্থাংশেরও অধিক দখল করে আছে। আর্যদের পর এদেশে মঙ্গোলীয় বা ভোটচীনীয় জনগোষ্ঠীর আগমন ঘটে। কিন্তু বাংলার মানুষের রক্তের মধ্যে এদের রক্তের মিশ্রণ উল্লেখযোগ্য নয়। বাংলার উত্তর ও উত্তর পূর্ব সীমান্তে এদের অস্তিত্ত রয়েছে। গারো, কোচ, ত্রিপুরা, চাকমা ইত্যাদি উপজাতি এ গোষ্ঠীভুক্ত। পরবর্তীকালে আরব, তুর্কী, মোঙ্গল, ইরানী ও আফগান রক্ত এর সাথে মিশ্রিত হয়। বস্তুত বাঙালী একটি শংকর জাতি হলেও দ্রাবিড়ীয় উপাদান এর সিংহভাগ দখল করে আছে।৭

বাংলার সংস্কৃতি
জীবন পদ্ধতিই হলো সংস্কৃতি। বাংলার বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজ নিজ সংস্কৃতি নির্ভর ছিল এবং যোগাযোগের স্বল্পতা হেতু স্ব-স্ব সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্র ছিল প্রকট- এতে কোন সন্দেহ নেই।

আদি-অস্ট্রেলীয় সংস্কৃতি
বাংলার জনসৌধ বিনির্মাণে যাদের অবদান রয়েছে তারা হলো আদি-অস্ট্রেলীয় (চৎড়ঃড় অঁংঃৎড়ষড়রফ) জনগোষ্ঠী। এরা অস্ট্রিক নামে পরিচিত। কুমিল্লা হতে চট্টগ্রাম হয়ে যে পথ নিু বার্মা (মায়ানমার) পর্যন্ত বি¯তৃত সেই পথ ধরে তারা বঙ্গ অঞ্চলে আগমন করে। অস্ট্রেলিয়া ও তাসমেনিয়ার বর্তমান আদিবাসীরা এই অস্ট্রিকদের বংশধর। কারো কারো মতে তারাই বাংলার নব্য-প্রস্তর যুগের জন্মদাতা। এ অঞ্চলে কৃষিকর্মের আদি সূচনার কৃতিত্ব তাদেরই।৮ এদের সভ্যতা ছিল মূলত গ্রাম কেন্দ্রিক। শরৎকুমার রায় মনে করেন, পঞ্চায়েত প্রথা সম্ভবত ভারতে প্রথম এদেরই প্রবর্তিত। পঞ্চায়েতকে এরা সত্যসত্যই ধর্মাধিকরণ জ্ঞানে মান্য করে। এখনও আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার পূর্বে মুন্ডা সাক্ষী তার জাতি-প্রথা অনুসারে পঞ্চের নাম নিয়ে এই বলে শপথ করে: ‘সিরমারে-সিঙ্গবোঙ্গা ওতেরে পঞ্চ’ অর্থাৎ আকাশে সূর্য-দেবতা পৃথিবীতে পঞ্চায়েত।৯

দ্রাবিড়ীয় সংস্কৃতি
আজ থেকে প্রায় হাজার হাজার বছর পূর্বে দ্রাবিড় জাতি পশ্চিম এশিয়া থেকে বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে হিমালয়ান উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তাইগ্রীস, ইউফ্রেতিস নদীর অববাহিকায় জীবন অতিবাহিতকারী দ্রাবিড়রা স্বভাবতই ভারতের বৃহত্তম নদীগুলোর অববাহিকা ও সমুদ্রোপকূলকে নিজেদের আবাসভূমি হিসেবে বেছে নেয়। তাদেরই একটি দল গঙ্গা মোহনায় স্থায়ী বসতি স্থাপন করে উন্নততর সভ্যতা গড়ে তোলে।১০ খৃষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে বাংলার এ দ্রাবিড়দের শৌর্যবীর্য ও পরাক্রমের কাছে স্বয়ং বিশ্ববিজয়ী আলেকজান্ডার নতি স্বীকার করেছেন। গ্রীক ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন: এদের চার হাজার সুসজ্জিত রণ-হস্তী ও অসংখ্য রণতরী ছিল। এ জন্য অপর কোন রাজা এদেশ জয় করতে পারেনি। এদের রণ হস্তীর বিবরণ শুনে আলেকজান্ডার এ জাতিকে পরাস্ত করার দুরাশা ত্যাগ করেন। মেগাস্থিনিশ থেকে শুরু করে প্লিনি, প্লতর্ক, টলেমী প্রমুখ সমকালীন গ্রীক ঐতিহাসিক, ভৌগলিক ও পন্ডিতগণ এ সময়কার বাংলার অধিবাসীদের গৌরবোজ্জল সভ্যতা ও সংস্কৃতির সাক্ষী দিয়ে গেছেন। এ সময় বাংলার রাজা মগধাদি দেশ জয় করে ভারতের পূর্ব সীমান্ত থেকে পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর তীর পর্যন্ত এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। দু:খের বিষয়, বাংলার এ গৌরবোজ্জল যুগ সম্পর্কে কয়েকজন বিদেশী লেখকের লেখা ছাড়া আমাদের এতদ্দেশীয় বইপত্রে এর কোন উল্লেখ নেই। বরং এদেশের আর্য ধর্মশাস্ত্র পুরাণে বাংলার এ রাজ বংশকে শূদ্র নামে অভিহিত করা হয়েছে। আর্যদের প্রধান ধর্মশাস্ত্র ঋগে¦দে এ দেশের অধিবাসীদেরকে দস্যু বা দাস আখ্যা দেয়া হয়েছে। পুরাণ ও ঋগে¦দের বক্তব্য থেকে বাংলার দ্রাবিড়দের বিরুদ্ধে আর্যদের ক্রোধ ও আক্রোশের প্রমাণ পাওয়া যায়।১১

আর্যদের এ ক্রোধের মূলে কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণই বিদ্যমান নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণও রয়েছে। দ্রাবিড়ীয় ও আর্য সভ্যতার মূল সংঘাত ধর্মীয় ও সংস্কৃতিগত। আর্যরা ছিল মুশরিকী সভ্যতা ও সংস্কৃতির পূর্ণ অনুসারী। তারা অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য, গগন, পবন, ঝড়, বৃষ্টি, সমুদ্র, নদী, বৃক্ষ প্রভৃতির পূজা করতো। পরে প্রস্তর পূজা ও মূর্তি পূজাও
তাদের মধ্যে প্রবেশ করে। যাগ-যজ্ঞ ও বলিদান ছিল তাদের পূজার অঙ্গ। দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য তারা নর বলিদান করতো।১২

পৃষ্ঠা- ৪
আর্য আগমনকালে দ্রাবিড়দের ধর্ম কি ছিল এ সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট তথ্য জানা না গেলেও আর্যরা যে, দ্রাবিড়দের ধর্মের ঘোর বিরোধী ছিল তা বেদ প্রভৃতি আর্য ধর্ম গ্রন্থাদি থেকে জানা যায়। দ্রাবিড়দের তৈরী যে উন্নততর সিন্ধু সভ্যতাকে আর্যরা ধ্বংস করেছিল তার ধর্ম কি ছিল এ নিয়ে বহু গবেষণার পরও পন্ডিতগণ কোন যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি। মোহন-জো-দারো, হরপ্পা ও চানহুদাড়োতে যে সব ক্ষুদ্রাকৃতির মৃত্তিকা নির্মিত খেলনা ও সীল পাওয়া গেছে সেগুলো থেকে কেউ কেউ মুর্তি ও দেব-দেবীর কল্পনা করেছেন। বিভিন্ন বড় বড় বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে এগুলো পাওয়া গেছে। এ বাড়িগুলোর মধ্যে পূজানুষ্ঠানের ন্যায় কিছু নিদর্শন কল্পনা করা হয়েছে। অথচ এ ধরনের কোন কোন বাড়ির ধ্বংসাবশেষকে হয়তো উপসানালয় বলে সন্দেহ করা যায় কিন্তু সেগুলোর মধ্যে কোন বিগ্রহ বেদী বা শিরকীয় ধর্মানুষ্ঠানমূলক অন্য কোন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়নি১৩।

আমাদের মতে সিন্ধু সভ্যতায় ধর্মীয় সংঘাত ছিল। দ্রাবিড়গণ ছিলেন সেমেটিক। কাজেই তাওহীদ ভিত্তিক সংস্কৃতিরও সেখানে অস্তিত্ব ছিল। উপরোক্ত উপাসানালয়গুলো মসজিদ সদৃশ। হরপ্পায় (পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মন্টগোমারী জেলায় অবস্থিত) আবিস্কৃত সুবিশাল ও সুরক্ষিত সৌধের পরিচয় থেকে হুইলার অনুমান করেছেন, সুমের ও আক্কাদের মতই সিন্ধু সাম্রাজ্যও খুব সম্ভব কোন রকম ‘পুরোহিতরাজের’ শাসনে ছিল বা এ শাসন ব্যবস্থার প্রধানতম অঙ্গ ছিল ধর্ম।১৪ সম্ভবত হুইলারের এ অনুমান মিথ্যাা নয়। যুগে যুগে এবং দেশে দেশে আল্লাহ নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাঁরা মানুষের জীবন পরিশুদ্ধ ও সংস্কারের সাথে সাথে আল্লাহর নির্দেশ ও বিধান অনুযায়ী দেশের শাসন পরিচালনারও ব্যবস্থা করেন। সিন্ধু সাম্রাজ্যে প্রথম দিকে সম্ভবত এ ধরণের কোন নবীর শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত ছিল। নবীর ইন্তিকালের পর সেখানে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটলেও শাসন ব্যবস্থায় তখনও তাওহীদের প্রভাব ছিল। এসময় বহিরাগত পৌত্তলিক ধর্মের অনুসারী আর্যদের সাথে তাদের সংঘর্ষ ও বিরোধ বাধে।

দ্রাবিড়রা আর্যদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত উন্নত সভ্যতার অধিকারী ছিল। তারা বন্য জন্তু জানোয়ারকে পোষ মানাতে জানতো। গো-পালন ও অশ্বচালনা বিদ্যাও তাদের আয়ত্তাধীন ছিল। কৃষি কাজ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতো। তারা উপাসনালয় ও গৃহ নির্মাণ করা জানতো। মিসর, ব্যাবিলন, আসিরিয়া ও ক্রীটের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। দক্ষিণ ভারতীয় উপকূল দিয়ে তারা ভূমধ্য সাগরীয় দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক ও তামাদ্দুনিক সম্পর্ক কায়েম করেছিল। মোট কথা তারা নাগরিক সভ্যতার অধিকারী ছিল। তাঁরা ছিল সেমেটিক তাওহীদবাদী ধর্মের অনুসারীদের উত্তরসুরী।১৫

আর্যসংস্কৃতি
সত্য ধর্ম বিরোধী এবং পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী আর্যরা ভারতবর্ষে আসে ইরান থেকে। ভারতে প্রবেশ করার পর রাজনৈতিক বিজয়ের সাথে সাথে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিজয় লাভের জন্যও তারা মরিয়া হয়ে ওঠে। এ প্রসংগে বাংলাদেশ সংস্কৃতি কমিশনের ভাষ্য: ‘‘আর্যরা ভারতবর্ষে আগমন করেছিল একটি নতুন সংস্কৃতি নিয়ে। সমগ্র উত্তর ভারত তাদের করায়ত্ত হয়েছিল। তাদের প্রভাব ও অহমিকায় ভারতবর্ষে একটি নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছিল। তারা আনুগত্যের আহ্বান জানিয়েছিল সকল জাতিকে। যে জাতি তাদের এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেছিল তারা বঙ্গ জাতি।১৬ এই প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে একটি দুর্দান্ত সাহস আমরা লক্ষ্য করি। আমাদের সংস্কৃতির উৎসমূলে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পরিশেষে আর্যদের দলীয় শক্তি, উন্নততর অস্ত্র ও কলা-কৌশলের কাছে বাংলার আদিবাসীরা পরাজয় স্বীকার করে। নবাগত শত্র“র ভয়ে তাদের অধিকাংশ দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতে সরে আসে। এবং কিছু কিছু অনার্য জাতি লোকালয় থেকে দূরে পাহাড়-পর্বত ও জঙ্গলে আশ্রয় গ্রহণ করে। আবার অনেকেই তাদের অধীনতা স্বীকার করে নেয়। এভাবে মৌর্য বিজয়কাল (খৃষ্ট পূর্ব ৩০০ অব্দ) থেকে এ প্রভাব বিস্তারের কাজ শুরু হয় এবং গুপ্ত রাজত্বকাল (৩২০-৫০০ খৃ.) চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতে বাংলাদেশে আর্য ধর্ম ভাষা ও সংস্কৃতি প্রত্যক্ষভাবে শিকড় গড়ে। ১৭

আর্যগণ ছিল লম্বা আকৃতির। তাদের গায়ের রং ছিল ফর্সা এবং নাক ছিল খাড়া। তারা নিজেদের অপরাপর জনগোষ্ঠীর চেয়ে সেরা মনে করতো। নিজেদের ছাড়া অন্যদের তারা বলতো অনার্য। অনার্যদের তারা দস্যূ, অসুর, রাক্ষস ইত্যাদি হিসেবে অভিহিত করেছে। আর্য সমাজে পুরুষেরা অনেক বিয়ে করতে পারতো। নারীগণ একটির বেশি বিয়ে করতে
পারতো না। কালক্রমে আর্য সমাজে চারটি শ্রেণীর সৃষ্টি হয়: ব্রাক্ষণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। ব্রাহ্মণগণ ছিল সমাজের বর্ণশ্রেষ্ঠ। তারা পুরোহিত হিসেবে পূজা-অর্চনা করতো। যারা অস্ত্র চালনা শিখতো এবং যুদ্ধে অংশ নিত তারা ছিল সমাজের দ্বিতীয় শ্রেণী। তাদেরকে বলা হতো ক্ষত্রীয়। সমাজের তৃতীয় শ্রেণীকে বলা হতো বৈশ্য। তারা কৃষিকাজ

পৃষ্ঠা- ৫
ওব্যবসা বাণিজ্য করতো। আর এ তিন শ্রেণীর যারা সেবা করতো তাদেরকে বলা হতো শূদ্র। পরাজিত অনার্যগণ শূদ্র শ্রেণীভুক্ত। আর্যগণ সুতি ও পশমি কাপড় পরতো। নারীগণ সোনা ও রূপার গয়না পরতো। তারা নাচ-গান পছন্দ করতো। দৌড়-ঝাঁপ, শিকার, তীর ছোঁড়া, বর্শা নিক্ষেপ, মল্লযুদ্ধ প্রভৃতিতে তারা খুব আনন্দ পেত। আর্যদের ধর্মগ্রন্থের নাম বেদ।

জৈন সংস্কৃতি
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, আর্য সমাজে ছিল বর্ণবৈষম্য। ব্রাহ্মণগণ নিজেদের সমাজের সেরা মনে করতো। ক্ষত্রীয়গণ ব্রাহ্মণদের বাড়াবাড়িতে খুবই অসন্তুষ্ট ছিল। এমনি এক সময়ে ভারতে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব হয়। দুটি ধর্মেরই প্রচারক ছিলেন দু’জন ক্ষত্রীয় রাজকুমার। জৈন ধর্মের প্রচারক বর্ধমান মহাবীর খৃষ্টপূর্ব ৫৯৯ অব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ২৮ বছর বয়:ক্রমকালে মানবতার দুর্দশা দূরীকরণার্থে তিনি গৃহত্যাগ করে সত্যের সন্ধানে বনে-জঙ্গলে কৃচ্ছ্রসাধনে ব্রতী হন। একাদিক্রমে চৌদ্দ বছর ধ্যান, তপস্যা ও কৃচ্ছ্রসাধনার পর তিনি সত্যের সন্ধান লাভ করেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধর্ম প্রচারের পর বিহারের বাওয়াপুরী নামক স্থানে তিনি দেহত্যাগ করেন। এ ধর্মের মূল শিক্ষা হচ্ছে অহিংসা পরম ধর্ম। এ অহিংসা মানুষ, জীব-জন্তু, পক্ষী, উদ্ভিদ সবার প্রতি সমানভাবে প্রযুক্ত হবে। পরবর্তীকালে এ অহিংসা হিন্দু ধর্মেরও অংশে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে জৈনধর্ম হিন্দু ধর্মের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।১৮ জৈন ধর্ম একটি সার্বিক জীবন পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলায় কোন একক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। বাংলায় জৈন ধর্মের প্রভাব ছিল দুর্বল। আবার এই প্রভাব প্রায় রাঢ় অঞ্চলেই সীমিত ছিল। বৌদ্ধধর্মের আগে রাঢ়-বরেন্দ্রে জৈন ধর্ম প্রচারিত হয়। ‘ৃ.জৈন বৌদ্ধ বিরোধ সংঘর্ষ হয়েছিল নিশ্চয়ই, কিন্তু তার রূপ-স্বরূপ আজ আমাদের সামনে তেমন স্পষ্ট নয়। দিব্যাবদান সূত্রে জানা যায়, অশোক পুন্ড্রবর্ধনে বৌদ্ধ ধর্মের অবমাননায় রুষ্ট হয়ে আঠারো হাজার আজীবিক বা নিগ্রন্থ জৈন হত্যা করেছিলেন।১৯ মনে হয় বৌদ্ধদের বিরূপতায় বাংলাদেশে জৈন সংস্কৃতি উচ্ছেদ হয়।২০

বৌদ্ধ সংস্কৃতি
বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক ছিলেন গৌতম বৌদ্ধ। হিমালয়ের পাদদেশে কপিলাবস্তু নগরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। যশোধরা নাুী এক অনিন্দ্য সুন্দরী মহিলা ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাঁর পুত্রের নাম ছিল রাহুল। কিন্তু সুন্দরী স্ত্রী ও গৃহ সংসারের আরাম আয়েশ তাঁর অস্থির চিত্তকে শান্তি ও নিশ্চিন্ততা দানে সক্ষম হয়নি। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও আর্য দর্শনও তাঁর তৃপ্তি সাধনে সক্ষম হয়নি। অবশেষে একদা গভীর রাতে স্রষ্টার অস্তিত্বের গূঢ় রহস্যের দ্বারোদঘাটনে তিনি সংসারের মায়া ত্যাগ করে গৃহ হতে নিস্ক্রান্ত হন। ছয় বছর কঠোর সাধনার পর চল্লিশ বছর বয়সে তিনি সত্যের সন্ধান লাভ করেন। চল্লিশ বছর অবধি অব্যাহতভাবে সত্যধর্ম প্রচারের পর ৮০ বছর বয়সে (খৃষ্টপূর্ব ৪৮৭ অব্দে) তিনি কুশী নগরে দেহত্যাগ করেন। তাঁর নিজের সমগ্র পরিবার ও গোত্র তার ধর্ম গ্রহণ করে। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর ধর্ম বিপুল সাড়া জাগায়। কিছু কালের মধ্যে তাঁর ধর্ম ভারতের প্রধানতম ধর্মে পরিণত হয়। এশিয়ার বিভিন্ন জাতির কাছেও তা সমাদৃত হয়।

বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা হচ্ছে: অহিংসা, দয়া, দান, সৎচিন্তা, সংযম, সত্যভাষণ, সৎকার্য সাধন, স্রষ্টাতে আত্মসমর্পণ প্রভৃতি মানুষের মুক্তি লাভের প্রধান উপায়। যাগ-যজ্ঞ ও পশু বলী দিয়ে ধর্ম পালন করা যায় না। ধর্ম পালন করতে হলে ষড়রিপুকে বশ করে আত্মাকে নিষ্কলুষ করতে হয়।

বুদ্ধদেব সর্বপ্রথম ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি দার্শনিক মতবাদ এবং নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন। বৌদ্ধধর্ম ও জৈনধর্মের আঘাতে ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। বুদ্ধ জন্মগত জাতি প্রথাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। তিনিই ছিলেন হিন্দু ভারতের প্রথম বিপ্লবী সন্তান।২১ বুদ্ধদেবের চিন্তাধারা ছিল নি:সন্দেহে একটি ভাববিপ্লব। আর বুদ্ধের ভাবধারা প্রসূত সমাজ বিন্যাস ছিল এক সামাজিক বিপ্লব। তাদের সমাজের আলোকে তারা একটি সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিনির্মাণ করেছিল। কিন্তু তাদের সেই বিপ্লব তথা আদর্শ ও সমাজ চেতনা তারা ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। বিভিন্ন প্রকার অবৌদ্ধমত বৌদ্ধ সমাজে অনুপ্রবেশ করে তাদের মধ্যে অবক্ষয় সৃষ্টি করে। এরই সুযোগে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধদের ওপর আদর্শিক, সাংস্কৃতিক এবং দৈহিক আঘাত শুরু করে। পরিণামে ব্রাহ্মণ্যবাদী উৎপীড়ন ও নিষ্ঠুরতায় বৌদ্ধ ধর্মের মত এত প্রকান্ড মহীরূহ উৎপাটিত হলো।২২ জন্মভূমি হতে বৌদ্ধধর্ম নির্বাসিত হলেও ভারতের বাইরে,

পৃথিবীর এক বৃহৎ অংশ জুড়ে- তিব্বত, সিংহল, ব্রহ্মদেশ, থাইল্যান্ড, ইন্দোচীন, ভিয়েতনাম, জাপান, চীন প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধরা এখনো সংখ্যা গরিষ্ঠ হয়ে বসবাস করছে।
পৃষ্ঠা- ৬
মোটকথা, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে একদিকে হিন্দু ধর্মের মধ্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল এবং অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের অত্যাচার ও নিপীড়নে গোটা ভারতের জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ধীরে ধীরে দ্রাবিড় অধ্যুষিত বাংলায় এসে আশ্রয় নিচ্ছিল। সপ্তম শতকের পর বৌদ্ধ ধর্মই বাংলায় প্রবল হয়। অষ্টম শতকে বাংলায় পালরাজাগণের অভ্যুদয়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এ সময়েই বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের ব্যাপক উন্নতি হয়। প্রাচীন বাংলা ভাষার নিদর্শন চর্যাপদগুলো এসময়েই রচিত হয়। একাদশ শতকের শেষভাগ থেকে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত হিন্দু ধর্ম ও সেন রাজবংশের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্মের ওপর প্রচন্ড আঘাত আসে। বৌদ্ধরা নিপীড়িত হতে থাকে।২৩

সেন আগমনে বিপর্যস্ত সংস্কৃতি
পালদের পরে বহিরাগত সেনরা এসে এদেশকে নিজেদের অধিকারে রেখেছিল। খুব দীর্ঘকাল না হলেও প্রায় পঁচাত্তর বছর তারা এ অঞ্চল শাসন করেছিল। এখানকার মানুষকে স্বধর্মচ্যুত করবার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল এবং কর্ণাটক ও কর্ণকুঞ্জ থেকে সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ এনে এ অঞ্চলের সংস্কৃতির প্রকৃতিতে পরিবর্তন আনবার চেষ্টা করেছে। এরা অত্যন্ত নিষ্ঠুর আকারে জাতিভেদ প্রথা প্রবর্তন করে এবং বৌদ্ধদের উৎখাত করার চেষ্টায় সকল শক্তি নিয়োগ করে। এ উৎখাত চেষ্টায় তারা যে কঠোরতার নিদর্শন রেখে গেছে তা বাংলার সংস্কৃতির মধ্যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছিল। অল্প সময়ের মধ্যে সেন রাজাদের শাসনে রাজ দরবারের গৃহীত নীতি হিসেবে সংস্কৃত উচ্চবিত্তদের আসরে স্থান লাভ করে। রাজ দরবারে সংস্কৃত ভাষার কবি, সঙ্গীতজ্ঞ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্থান হয় এবং রাজ আনুকূল্যে একটি হিন্দু সংস্কৃতি এ দেশের ওপর আরোপিত হয়।২৪

হিন্দু সংস্কৃতি
বর্ম ও সেন রাজাগণ ছিলেন বৈষ্ণব ও শৈব ধর্মাবলম্বী। এরাই বাংলায় মূর্তি পূজার প্রচলন করেন। ধর্মের নামে সতীদাহের ন্যায় গর্হিত প্রথার প্রচলন এখানে ছিল। বাংলায় বৈদিক রীতিতে পূজা পাঠ করার জন্য বর্ম ও সেন রাজাগণ বৈদিক ব্রাহ্মণ আমদানি করেন। বাংলায় কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তনও তাঁদের একটি কীর্তি। জাতিভেদ ও বর্ণাশ্রম প্রথাকে তাঁরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। রাজশক্তির প্রচন্ড দাপটে হিন্দু সংস্কৃতির অগ্রাভিযান চললেও সাধারণ ধনী ও উচ্চ শ্রেণীর মধ্যেই হিন্দু সংস্কৃতি সীমাবদ্ধ ছিল। এবং জনসাধারণের অধিকাংশই বৌদ্ধ সংস্কৃতির অনুসারী ছিল।২৫

সার কথা হলো খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণ পর্যন্ত বাংলার অনার্য অধিবাসীরা আর্যদের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব প্রতিহত করে আসছিল। কিন্তু খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষের দিকে (৩২৩ খৃ. পূ.) পাটলিপুত্রে নন্দরাজ বংশের পতন ও শক্তিশালী মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলায় আর্যদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। খৃস্টীয় চতুর্থ শতকের শেষ অবধি গুপ্ত রাজ বংশের অধিকার পর্যন্ত ৮০০ বছরের মধ্যে বাংলায় আর্যদের পরিপূর্ণ প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এ প্রভাব সর্বগ্রাসী রূপ নেয়। দ্রাবিড় ও অনার্য শক্তি স্তিমিত হবার সাথে সাথে আর্য ও হিন্দু সংস্কৃতি দ্রুতবেগে অগ্রসর হতে থাকে। সংক্ষেপে এই হলো প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক চিত্র।

মুসলিম সংস্কৃতি
অত:পর শুরু হলো মধ্যযুগ। প্রাচীনকালের অবসান ও মধ্যযুগের শুরু ইসলাম আবির্ভাব সংশ্লিষ্ট। হযরত মুহাম্মাদ (সা:) ছিলেন শেষ নবী। তাওহীদবাদী সভ্যতা-সংস্কৃতির শেষ শিক্ষক ও সত্য দ্বীন ইসলামের সর্বশেষ প্রচারক। নবুওয়াত লাভ করার পর দীর্ঘ ২৩ বছরের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও সাধনায় একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বমানবতার রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের সুষ্ঠ পরিচালনার ব্যবস্থা করেন। আল্লাহর নির্দেশিত পথে মানুষকে পরিচালনা করাই ছিল তাঁর দায়িত্ব। নিজের জীবদ্দশায় এ দায়িত্ব তিনি পুরোপুরি পালন করে যান। তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর সুশিক্ষিত সাহাবীগণের কাছ থেকে সত্যের আলোকে উদ্দীপ্ত তাবিয়ীগণ, তাবিয়ীগণের কাছে দীক্ষাপ্রাপ্ত তাবা-তাবিয়ীগণ এবং এভাবে পর্যায়ক্রমে মুসলমানদের বিভিন্ন দল ইসলামের সত্যবাণী ও তাওহীদভিত্তিক সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থার কাঠামো নিয়ে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন।

পৃষ্ঠা- ৭
মুসলমানদের এ উপমহাদেশে আগমন দু’টি ধারায় বিভক্ত। আগমনকারীদের একটি ধারা ছিল সমুদ্র পথ ধরে। আর অন্য ধারাটি ছিল স্থলপথে। যারা সমুদ্রপথ অনুসারী তাঁরা প্রধানত বাণিজ্যিক মকসূদ নিয়ে আসতো। প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য উপলক্ষে তাদের এ অঞ্চলে আনাগোনা ছিল। তাঁদের সাথে বহু দরবেশ-আওলিয়া উপমহাদেশে আগমন করেন। এই সমুদ্র পথযাত্রীরা মূলত ছিল আরব। তাঁদের চরিত্র-মাহাত্ন্য স্থানীয় লোকদের বিমুগ্ধ করে। তাঁরা কেবল তিজারতী করেননি সঙ্গে সঙ্গে একটি মতবাদও প্রচার করেন। এবং তাঁরা একটি বিশেষ আকর্ষণীয় মূল্যবোধ সমন্বিত ছিলেন। তাঁরা একটি অনুকরণীয় সংস্কৃতিরও পা’বন্দ ছিলেন।

ইসলামই ছিল এ সংস্কৃতির নিয়ামক শক্তি। আর স্থলপথে যারা এসেছিলেন তাঁরা মুখ্যত ছিলেন যোদ্ধা। রাজ্য জয় তাঁদের লক্ষ্য ছিল। তবে তাঁরা যেহেতু ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন- তাই ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিই ছিল তাঁদের প্রধান নৈতিক হাতিয়ার। তাঁদের সংস্কৃতি হলো ইরানী সংস্কৃতি যা নির্মিত হয়েছিল ইরান ও আরব উপাদানে। ইসলাম ছিল এ সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রক।২৬ ইসলাম মানুষের মন-মানষিকা ও চিন্তা ধারায় আমূল পরিবর্তন সূচনা করে। তাই ইসলাম ভাব-বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল বলা যায়। বর্ণপ্রথা তথা বর্ণ বিদ্বিষ্ট সমাজে মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন সমাজ প্রতিষ্ঠাও এদেশের মানুষের নিকট ছিল এক নব আবিস্কার। বৌদ্ধ ধর্ম বিলুপ্তির পর জনগণ বর্ণভেদহীন সমাজ বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। স্তরবিহীন সমাজ এদেশের মানুষের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার অতীত হয়ে পড়েছিল। ইসলামের সমাজ বিন্যাস তাদের নিকট ছিল সম্পুর্ণ নতুনত্বে বৈশিষ্ট্যময়। যদিও খাঁটি ইসলামী সমাজ সংস্কৃতি এখানে কখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তথাপি যেটুকু হয়েছিল তাও ব্রাহ্মণ্য সমাজ ও সংস্কৃতি হতে বেহতের ছিল। সে জন্যই বলা হয় ইসলাম এক নতুন যুগের স্রষ্টা। এ যুগটাই হলো বাংলার মধ্যযুগ। ইসলামের মোকাবিলায় প্রাচীন যুগের ইতি রচিত হলো। তবে মধ্যযুগ সমগ্র উপমহাদেশে একসঙ্গে দেখা দেয়নি। কারণ মুসলমানেরা ইসলামের বাণী একই সময় উপমহাদেশের এক প্রান্ত হতে অন্যপ্রান্তে বহন করে নিয়ে যেতে পারেনি।

ড. মুহম্মদ এনামুল হক বলেন, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী যে সময় বঙ্গ বিজয় (১২০১ খৃ:) করেন, তার অনেক কাল আগে অর্থাৎ অষ্টম শতাব্দীর গোড়াতে আরব বণিকগণ বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ও ঢাকা বিভাগের সমুদ্র কুলবর্তী অঞ্চলে ইসলামের বাণী বহন করে আনেন। খৃষ্টীয় অষ্টম ও নবম শতাব্দী থেকে চট্টগ্রাম বন্দর আরব বণিকদের উপনিবেশে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে চট্টগ্রাম ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে আরব ব্যবসায়ীদের প্রভাব প্রতিপত্তির ফলে যখন স্থানীয় লোকজন ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলাম এদেশের বহু অঞ্চলে স¤প্রসারিত হয়, তখন আরব ও মধ্য এশিয়ার বহু পীর, দরবেশ ও সূফী-সাধক ইসলাম প্রচারের জন্য স্বদেশ ত্যাগ করে পূর্ব বঙ্গের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন।২৭

বাংলাদেশের সঙ্গে মুসলিম আরবগণের যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় তার প্রাচীনতম ঐতিহাসিক নিদর্শন বিখ্যাত আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদ (৭৮৬-৮০৯ খৃ:) এর খিলাফতকালের একটি আরবী মুদ্রা। মুদ্রাটি রাজশাহী জেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের (প্রকৃত নাম- সোমপুর বিহার) ধ্বংসস্তুপের ভেতর আবিস্কৃত হয়েছে। আল-মুহাম্মদীয়া টাকশালে ৭৮৮ খৃ: (১৭২ হি.) এই মুদ্রাটি মুদ্রিত হয়। আবার স¤প্রতি কুড়িগ্রাম জেলায় এমন একটি মসজিদ আবিস্কৃত হয়েছে যা সপ্তম শতাব্দীতে (৬৮৯ খৃ:) তৈরি করা হয়েছিল। এ থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, এদেশে মুসলমানগণ আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করার জন্য মসজিদ তৈরি করতেন।২৮ উল্লেখ্য যে, আরব বণিকগণ চট্টগ্রাম অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করে বাণিজ্যের সঙ্গে ইসলাম প্রচারেও মনোনিবেশ করেন এবং ইসলামে দীক্ষিত করে স্থানীয় রমণীদের সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন।২৯

মশহুর সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন- ‘‘বাংলাদেশে ইসলামের প্রথম আবির্ভাব হয় পশ্চিম ভারতের স্থলপথ দিয়া নয়, দক্ষিণ দিক দিয়া জলপথে। চাটগাঁ বন্দর হইয়াই ইসলাম বাংলায় প্রবেশ করে সর্বপ্রথম। এই হিসাবে বাংলার কৃষ্টিক পটভূমি রচনায় চাটগাঁ বন্দরের ভূমিকা ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বশ্রেষ্ঠ। এই সম্পর্কে দুইটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের কথা আমাদের স্মরণ রাখা দরকার। বাংলায় মুসলিম রাষ্ট্রশক্তি প্রবেশ করে পশ্চিম সীমান্ত পথে, উত্তর ভারত হইতে। পক্ষান্তরে বাংলায় ইসলাম প্রবেশ করে দক্ষিণ দিক হইতে চাটগাঁ বন্দর দিয়া। বাংলায় মুসলিম রাষ্ট্রশক্তির রূপ তুর্কী, পাঠান ও মোগলাইরূপ। পক্ষান্তরে ইসলাম ধর্মীয়রূপ খাঁটি আরবীরূপ।

উপমহাদেশের অপরাপর অঞ্চলের মুসলমানদের তুলনায় বাঙালী মুসলমানদের আড়ম্বরহীন অপ্রদর্শনবাদী, সতেজ ধর্মীয় চেতনাই বাঙালী মুসলমানদের এই ধর্মীয় বৈশিষ্টের স্বাক্ষর বহন করিতেছে। বাঙালী মুসলিম জনসাধারণের কথ্যভাষায়, মুখের জবানে ফার্সী, উর্দুর চেয়ে আরবী শব্দের প্রাচুর্য দেখা যায় বেশী।ৃৃৃৃ.পূর্বে আরাকান,
পৃষ্ঠা- ৮
উত্তরে ত্রিপুরা ও পশ্চিমে বাকেরগঞ্জ ধরিয়া বিচার করিলে দেখা যাইবে চাটগাঁই এসব কৃষ্টি সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি ছিলো। ৃৃৃৃৃ. আধুনিক আলোচনাতেও দেখা যাইবে যে, বাংলার কৃষ্টি-সাহিত্যের ব্যাপারে চাটগাঁয়ের অবদানের তুলনা নাই। এই বিষয়ে চাটগাঁ-ই পাক-বাংলার পটভূমি।৩০

গৌড়বঙ্গের রাজা লক্ষণ সেন ছিলেন হিন্দু। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ প্রজা ছিলো বৌদ্ধ। বৌদ্ধ প্রজারা হিন্দু রাজার অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে তুর্কীগণের আগমন প্রতীক্ষা করছিল। এমনি এক শুভ মুহূর্তে (১২০১ খৃ.) বখতিয়ার খলজী বঙ্গ জয় করেন। বখতিয়ার খলজী একটি নতুন বিশ্বাস ও চৈতন্য বঙ্গ অঞ্চলে নিয়ে আসেন। এদেশে মুসলমানগণ এসেছে বহু পূর্বেই। কিন্তু তখন তাঁরা কোন রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেনি। বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ বিজয়ের (ত্রয়োদশ শতকে) মাধ্যমে এই প্রথম বারের মতো তাঁরা রাষ্ট্রশক্তির সহযোগিতা লাভ করেন। ফলে ইসলাম প্রচারের ধারা বন্যার বেগে এগিয়ে চলে। এ সময়ে আরব, পারস্য, তুর্কী, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও পাক-ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ওলী, সূফী-দরবেশ ও আলিম প্রভৃতি ইসলাম প্রচারক ছাড়াও বহু মুসলিম এদেশে এসে স্থায়ীভাবে বসাবাস করতে থাকেন এবং নানা স্তরের রাজপদে ও সৈন্য বিভাগে নিযুক্ত হন। এভাবে বহু বিদেশী মুসলিম এদেশে এসে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান এবং তাঁরাও দেশীয় হিন্দু, বৌদ্ধ, অনার্য ও পার্বত্য উপজাতিদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। এক দিকে ইসলামী ন্যায় বিচার ও সুশাসন, অন্যদিকে বিদেশ থেকে আগত মুসলিমদের উন্নত চরিত্র, শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সাম্য অত্যাচারিত অমুসলিমগণকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। এ সময়ে এ দেশের বিপুল পরিমাণে হিন্দু ও বৌদ্ধগণ ইসলাম গ্রহণ করেন।

এত বিপুল সংখ্যক হিন্দু ও বৌদ্ধ ইসলাম গ্রহণের পেছনে এদেশীয় রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাও কমদায়ী ছিলোনা। মুসলিম বিজয়ের পূর্বে সেন বংশীয় হিন্দু রাজাদের রাজত্বকালে ধর্ম-কলহ ও সা¤প্রদায়িক ভেদ-বৈষম্য এদেশের সমাজ জীবনকে শতধাবিচ্ছিন্ন করে জাতীয় জীবনকে করেছিল পঙ্গু। হিন্দু রাজারা বৌদ্ধদের প্রতি শুধু জুলুম-অত্যাচার করেই ক্ষান্ত হয়নি। বৌদ্ধদেরকে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা মনে করতো অশুচি। তারা তখন বৌদ্ধদের অস্তিত্ব লোপ করতে বদ্ধ পরিকর। তান্ত্রিকতাবাদের প্রভাবে বৌদ্ধ ও নাথ পন্থীগণের সামাজিক ও নৈতিক জীবন তখন অতি নিুস্তরে। ব্রাহ্মণ্যবাদের নিশপেষণে নিুবর্ণের হিন্দু সমাজ ছিল জীবনমৃত। জাতীভেদ, বর্ণবৈষম্য, অর্থনৈতিক ভেদ-বুুদ্ধি সবকিছু মিলে এদেশের সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনকে করেছিল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খন্ডে বিভক্ত, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসী, বিদ্বিষ্ট। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির উৎস তেত্রিশ কোটি কল্পিত দেবতা ও ভূত-প্রেত সম্বন্বীয় সহস্র রকমের কুসংস্কারে তারা ছিলো আচ্ছন্ন, ধর্ম-জীবন-দর্শন ও সংস্কৃতির বিকৃত ব্যাখ্যার গোলক ধাঁধাঁয় তারা হয়েছিলো আত্নকেন্দ্রিক, বহির্জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন, নিয়তির দাস, ভাগ্য-নির্ভর ও উদ্যামহীন। এদেশের সাধারণ সমাজ ব্রাক্ষণ্যবাদের স্বার্থসর্বস্ব জীবন-দর্শনকে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। কৌলিন্য প্রথা ও অস্পৃশ্যতার গ্লানি সমাজের নিুতর স্তরের অবহেলিত জনগণকে সর্বদাই পীড়া দিয়েছে। এরূপ পরিস্থিতিতে যখন তারা ইসলামের ধর্মনীতি ও জীবন দর্শণে দেখল সহজ সরল ধর্ম বিশ্বাস, অনাড়ম্বর উন্নত জীবন যাপন ও সদাচরণ এবং বিদেশাগত সূফী সাধক, আলীম ও মুসলিম প্রচারক ও বণিক প্রমুখের জীবনে তা রূপায়িত হতে দেখতে পেল, তখন স্বাভাবিক ভাবেই তারা তাতে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।৩২

এভাবে মুসলমানদের এ অঞ্চলে আগমনের ফলে সাংস্কৃতিক জীবনে নতুন মাত্রা সংযোজিত হলো। একটি নতুন স্থাপত্য রীতি এদেশে গড়ে ওঠলো যা দৃশ্যত শোভন এবং ব্যবহার উপযোগীতার আদর্শস্থল। সারা দেশে অসংখ্য মসজিদ নির্মিত হতে লাগল এবং মসজিদের গঠন প্রণালী একটি নতুন স্থাপত্য রীতির প্রবর্তন করলো। মুসলমানেরা বঙ্গ ভূখন্ড দখল করবার পর এ অঞ্চলের সংস্কৃতির বিপুল পরিবর্তন ঘটে। সেন আমলে সংস্কৃত ভাষার যে প্রভাব ছিলো সেই প্রভাব দূরীভূত হয় এবং তার পরিবর্তে আরবী ও ফার্সী ভাষার প্রভাব আমরা লক্ষ করি। এবং ভাষা শিক্ষার জন্য মাদরাসা স্থাপিত হয়। আর ধর্ম সাধনা ও ইবাদতের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় অসংখ্য খানকাহ ও মসজিদ। তখন মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাই ছিলো ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। বখতিয়ার খলজীর আরেকটি উল্লেখযোগ্য কীর্তি হচ্ছে নতুন নতুন নগর নির্মাণ। এভাবে নগর নির্মাণের সাহায্যে একদিকে যেমন নতুন সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছিলেন অন্যদিকে তেমনি এ দেশীয় গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারার মধ্যে পরিবর্তন এনেছিলেন। সেন আমলে জাতিভেদ প্রথার প্রভাবে নিু বর্ণের সাধারণ মানুষরা খুবই উৎপীড়িত ছিল। মুসলমান আগমনের ফলে এ উৎপীড়ন বন্ধ হবার সুযোগ ঘটে এবং সমাজে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ অসমর্থিত হতে থাকে। বখতিয়ার খলজীর আগমনকে নিুবর্ণের হিন্দুরা স্বাগত জানিয়েছিল কতকগুলো কারণে। প্রথমত সেনরা ছিলো বাহিরাগত এবং তারা বহিরাগত ব্রাহ্মণ এনে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার বিঘ্ন ঘটায়। দ্বিতীয়ত দেশী মাতৃভাষার সাহিত্য চর্চার বিরুদ্ধে এদের কঠোর নির্দেশ ছিলো। নরকে নিক্ষিপ্ত

পৃষ্ঠা- ৯
হবার ভয় দেখিয়ে দেশী ভাষার চর্চা থেকে এরা মানুষকে বিরত রাখবার চেষ্টা করে। তৃতীয়ত: দরবারের ভাষা হিসেবে
সংস্কৃত ভাষা প্রতিষ্ঠা পায় এবং এর ফলে সংস্কৃতির একটি উচ্চমার্গ জন্ম লাভ করে, যার সঙ্গে নিুবিত্ত মানুষদের সংস্কৃতির কোন যোগাযোগ ছিলো না। চতুর্থত : নগরের যে পরিকল্পনা সেনদের ছিল, সে নগর ছিল সীমাবদ্ধ এবং সংকীর্ণ। নিু বিত্তদের বাসস্থান ছিল নগরের বাইরে, অর্থাৎ নগর ছিল ব্রাহ্মণদের জন্য। এভাবে সাধারণ মানুষকে দেশের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে রাখার যে প্রবণতা গড়ে ওঠে সে প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই সাধারণ মানুষ বখতিয়ার খলজির আগমনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ এ অঞ্চেলের সংস্কৃতি বখতিয়ারের আগমনের পর একটি নতুন রূপব্যঞ্জনা লাভ করে।

মুসলমানদের শাসন আমলে এদেশে সংস্কৃতির নতুন দ্বার উন্মোচিত হয় এবং পাল আমলের মত নতুন করে মাতৃভাষার চর্চা চলতে থাকে। পালদের ধর্মীয় ভাষা ছিলো পালী। ধর্মীয় অনুশাসন এবং ধর্মগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে পালি ভাষা ব্যবহার করলেও সাহিত্যের ক্ষেত্রে তারা লোকভাষা ব্যবহার করেছিলেন। তেমনি মুঘল শাসনামলে ধর্মীয় ভাষা আরবী এবং দরবারের ভাষা ফার্সী হওয়া সত্বেও সাহিত্যের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার চর্চায় মুসলমান রাজন্যবর্গ উৎসাহ প্রদান করেছেন। এই সময়কালেই বাংলাভাষার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আরবী,ফার্সী ও তুর্কী শব্দ প্রবেশ করতে থাকে। এভাবে দু’হাজারের অধিক আরবী, ফার্সী ও তুর্কী শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ করে।৩৩

আসলে বাংলা ভাষার প্রকৃত চর্চা মুসলমান আমলেই শুরু। প্রথম দিকের লেখক ছিলেন প্রায় সকলেই হিন্দু। তাঁরা আর্য প্রভাবান্বিত ছিলেন। সংস্কৃত অনুসারী হয়ে তাঁরা কাব্য রচনা করেন। সে জন্য তাঁদের রচিত কাব্য সংস্কৃত শব্দ বহুল ছিল। কিন্তু তাদের এসব রচনা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ছিলনা। অবশ্য হিন্দু সমাজ ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিু শ্রেণীর জনগণের জন্য লেখা পড়া ছিল নিষিদ্ধ। সুতরাং বর্ণ হিন্দুদের কোন রচনায় সাধারণ মানুষের বোধগম্য শব্দ ব্যবহৃত হলো কিনা সে সম্পর্কে কোন ধারণা চিন্তা লেখকের থাকবার কথা নয়। তাই এসব হিন্দু লেখকেরা সংস্কৃতায়িত শব্দ ও হিন্দু শাস্ত্র কেন্দ্রিক এক বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ধারা প্রবর্তন করেন। পরে মুসলিম ধারা ক্রমে ক্রমে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পনের শতকের শেষ পদের কবি বিপ্রদাস পিপলাই ‘মনসা বিজয়’ কাব্য রচনা করেন। তার এই পুস্তকে আরবী ফার্সী শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কবি কঙ্কন মুকুন্দরাম ১৫৮৯ সালে তার ‘চন্ডীমঙ্গল’ রচনা করেন। তিনিও আরবী ফার্সী শব্দ ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে আরবী ফার্সী শব্দ সম্বলিত সাহিত্যই বাংলায় প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। এবং আরবী ফার্সী শব্দই বাংলা ভাষার বিরাট অঙ্গন দখল করে।৩৪

বাংলায় মুসলিম আগমনের ফলে এভাবে সামাজিক রীতিনীতি, ব্যবহার,পদ্ধতি ও সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। বিশেষ করে বাংলা ভাষার পরিবর্তন ঘটে এবং বাংলা ভাষার বর্ণিত জীবন কাহিনীর মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ এবং জীবন চেতনার স্বাক্ষর ধরা পড়ে। পৃষ্ঠা- ১০

তথ্য নির্দেশিকা
১. আবদুল মান্নান তালিব, বাংলাদেশে ইসলাম, ইফাবা, ঢাকা, ২য়সং, ২০০২, পৃ. ২২
২. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৩
৩. প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৩-২৪
৪. আসাদ বিন হাফিজ, ইসলাম সংস্কৃতি, প্রীতি প্রকাশন, ঢাকা ১৯৯৪, পৃ. ১০
৫. প্রাগুপ্ত,
৬. প্রাগুপ্ত, পৃ. ১১
৭. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৬
৮. মোহাম্মদ সোলায়মান, প্রসংগ সংস্কৃতি, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ঢাকা, ১ম সং, ১৯৯০, পৃ. ১০২-১০৩
৯. নীহার রঞ্জন রায়, বাঙালীর ইতিহাস (আদি পর্ব), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, ১ম সং, ১৪০০, পৃ. ৫০
১০. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৭
১১. প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৭-২৮
১২. প্রাগুপ্ত, পৃ. ২৮
১৩. দেবী প্রসাদ চট্ট্রোপাধ্যায়, ভারতীয় দর্শন, তা: বি: পৃ. ৬৯
১৪. প্রাগুপ্ত,
১৫. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ৩০
১৬. আসাদ বিন হাফিজ, প্রাগুপ্ত, পৃ. ১১
১৭. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুপ্ত, পৃ. ৩১
১৮. প্রাগুপ্ত, পৃ. ৪৬-৪৭
১৯. ড. আহমদ শরীফ, মধ্যযুগের সাহিত্যে সমাজ ও সংস্কৃতির রূপ, ১ম সং, ১৯৭৭, পৃ. ৭৭
২০. ড. আহমদ শরীফ, বাঙালীর চিন্তা-চেতনার বিবর্তন ধারা, তা: বি. পৃ. ৪১
২১. খাজিম আহমদ, ইতিহাস চর্চা ও সা¤প্রদায়িকতা, চতুরঙ্গ, কলকাতা, মার্চ, ১৯৮৮ সংখ্যা, পৃ. ৯৮১
২২. মোহাম্মদ সোলায়মান, প্রাগুক্ত পৃ. ১০৬-১০৭
২৩. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১
২৪. আসাদ বিন হাফিজ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪-১৫
২৫. আবদুল মান্নান তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১
২৬. মোহাম্মদ সোলায়মান, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১
২৭. ড. মুহাম্মদ এনামুল হক, পূর্ব পাকিস্তানে ইসলাম, ঢাকা পুনর্মুদ্রণ, ১৯৮৪, পৃ. ১৬-২০
২৮. ড. গোলাম সাকলায়েন, বাংলাদেশের সুফী-সাধক, ইফাবা, ঢাকা, ৪র্থ সং, ২০০৩, পৃ. ১৯
২৯. শইখ শরফুদ্দীন, অধ্যক্ষ, বাংলাদেশে সুফী-প্রভাব ও ইসলাম প্রচার, আদর্শ মুদ্রায়ণ, ঢাকা, ১ম সং, ১৯৮২, পৃ. ৩
৩০. আবুল মনসুর আহমদ,বাংলাদেশের কৃষ্টিক পটভূমি,দৈনিকসংগ্রাম,বৃহস্পতিবার ও বৈশাখ,১৩৯৫ বাংলা সংখ্যায় মুদ্রিত,পৃ,৯
৩১. এবন গোলাম সামাদ, ডক্টর, বাংলাদেশে ইসলাম, ইফাবা, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ.৭
৩২. শইখ শরফুরদ্দীন,প্রাগুপ্ত, পৃ.৯-১০
৩৩. আসাদ বিন হাফিজ,প্রাগুপ্ত,পৃ১৫-১৬
৩৪. মোহাম্মদ সোলায়মান,প্রাগুপ্ত,পৃ.১১৮

লেখক : ড: মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন