আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- সকাল ৭:৫২

আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সমকালের উত্তরণ : সংজ্ঞা ও পদ্ধতি

খেলাফতে উসমানির পতন ও বিশ^যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব এবং উম্মাহ ধারণার বিলুপ্তির পরে বিশে^র রাজনৈতিক তত্তে¡ নানা পরিবর্তন হয়। বিগত শতকগুলোতে ক্ষমতার পালাবদল হতো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। কখনো অভ্যুত্থান, কখনো বহিঃআক্রমন। কিন্তু ২য় বিশ^যুদ্ধের পরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু হয়। হ্যা, ৪৫এর পরেও সামরিক অভ্যুত্থানসহ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও সেটা আইনত অবৈধ বিবেচিত হতো।

এই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে জনমতের প্রাধান্য একটা মৌলিক নীতি হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের ক্ষমতা, ক্ষমতার পরিধি, মর্যাদা ও কর্তব্য সম্পর্কেও নতুন নতুন ধারণা তৈরী হয়। নতুন ধরণের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তৈরী হয়। জাতীয়তাবাদের চরম উত্থান হয়। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক তত্ত¡ ও ধারণার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়। যার সাথে অতীতের কোন তত্ত¡ পরিচিত ছিলোনা। এমনকি ইসলামের মতো সার্বজনীন মতবাদ এর প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ান ও এই নতুন পরিবর্তনের সামনে অসহায়ত্ববোধ করে।
এরপরে সময় অনেক অতিবাহেত হয়েছে। ৯০ এর পরে …………. পতন হয়। পৃথিবী একমেরু কেন্দ্রীক হয়ে পড়ে। পশ্চিমা ও আমেরিকান আধিপত্য সারা বিশে^ জেঁকে বসে। রাজনৈতিক তত্ত¡, ধারণা, আদর্শমান, সমাজ, মানুষ সম্পর্কে ধারণা সব কিছুতেই পশ্চিমা রাজনৈতিক ও জ্ঞানগত আধিপত্য বিস্তার করে।
এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী রাজনীতির পথ ও পদ্ধতি কি হবে? কি হওয়া উচিত? সমকালে ইসলামী আন্দোলন সমূহের সামনে এটা একটা বড় প্রশ্ন। বিশে^র ইসলামী কার্যক্রমকে মোটা দাগে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়-
১. দাওয়াতি কার্যক্রম : দাওয়াতি কার্যক্রম বিশ^ব্যাপী জোরালো ও প্রভাব বিস্তারকারী একটি ইসলামী আন্দোলন। নিজ কর্মকৌশল ও পদ্ধতিতে অটুট, নিরব ও ধারাবাহিক এই আন্দোলন, আক্বিদা, ইবাদত ও আখলাক নিয়ে কাজ করে। মানুষকে কোন রূপ চ্যালেঞ্জ না করে মানুষের আবেগ-অনুভ‚তিকে ব্যবহার করে এরা কাজ করে। পাশ্চাত্য জীবন ধারায় অভ্যস্ত মুসলমানদেরকে সেখান থেকে ফিরিয়ে ইসলামের দিকে ধাবিত করা এবং অমুসলিমদের ইসলামে শামিল করা এই ধারার ইসলামী আন্দোলনের বড় কৃতিত্ব।
২. ¯^শস্ত্র ধারা : শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাগুতকে হটিয়ে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করা এই ধারার লক্ষ্য। শক্তির মোকাবিলায় পাল্টা শক্তি ব্যবহার করা এদের কর্মনীতি, ¯^শস্ত্র ধারার ইসলামী আন্দোলনকে একক কোন নির্ধারক ব্যবহার করে মূল্যায়ন করা যায় না; বরং অবস্থার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দেশে এই ধারার মূল্যায়ন ভিন্ন রকম হবে। মুসলিম প্রধান এবং … শান্ত দেশে তাদের কার্যক্রম অনেক সময় বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়।
৩. সুফিবাদী ধারা : এই ধারাটা ভারত উপমহাদেশে প্রবল। এই ধারার কর্মনীতি হলো, একজন পীর থাকেন। তিনিই কেন্দ্রবিন্দু হন এবং তাদের একদল ভক্ত-অনুরক্ত থাকে। ভক্তরা পীরের কথায় জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করতে পারে। এরা ‘খোদা প্রেম’ ও ‘রাসূল প্রেম’ এ মাতোয়ারা থাকে। কিন্তু আক্বিদা, ইবাদত, মুয়ামালাত, মুয়াশারাত ও আখলাকে তারা কোরআন-সুন্নাহ’র তেমন অনুসরণ করেনন না। এরা দিবস কেন্দ্রিক জমায়েত হয়। জিকির করে কিন্তু বাস্তব জীবনে ইসলাম অনুসরণ এদের তেমন কোন আগ্রহ নেই।
তবে এই ধারায় কিছু ব্যতিক্রমও আছে। তারা তাদের ব্যক্তি জীবনে ইসলাম অনুসারী। কুরআন-সুন্নাহর পাবন্দি করে। কিন্তু মুয়ামালাত, মুয়াশারাত ও রাজনৈতিক জীবনে তারা ইসলাম নিয়ে আগ্রহী না।
৪. রাজনৈতিক ধারা : এই ধারার ৩টা উপধারা আছে। একটি উপধারা প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর মাঝেই আন্দোলন করে। কিন্তু প্রচলিত কাঠামোকে ব্যবহার করে নয়। তারা জাতি-রাষ্ট্রকে অ¯^ীকার করে। প্রচলিত সরকার কাঠামোকে সম্পূর্ণ বাতিল করে ‘নতুন’ ধরণের ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। হিজবুত তাহরির এই ধারার রাজনৈতিক সংগঠনের উদাহরণ।
২য় উপধারা সম্পূর্ণই প্রচলিত ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে। তারা দলের নীতি-রীতি-কৌশল, চলনে-বলনে এক কথায় সামগ্রিকভাবেই প্রচলিত কৌশল আত্মস্থ করে কাজ করে। এমনকি তারা ইসলামের নামটাও কিছু ক্ষেত্রে মুখে আনেন না। কৌশলগত করণেই তারা ইসলামের সাথে বাহ্যিক সকল সম্পর্ক এড়িয়ে যান। তুরষ্কের একেপি এই ধারার সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।
এই ধারার ৩য় যে উপধারাটি রয়েছে তারা প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে থেকে এবং একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রচলিত ব্যবস্থাকে ব্যবহার করেই এগুতে চায়। কিন্তু তারা প্রকাশ্যেই ইসলামের সাথে সম্পর্ক রাখে এবং তাদের কর্মসূচি, কর্মপন্থা সবকিছুতে ইসলামের প্রকাশ-প্রভাব বিদ্যমান। বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এই ধারার সংগঠনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

শেষোক্ত ধারার ইসলামী আন্দোলনটিই ইসলামের মূল তত্ত¡ ও ‘মেজাজে শরিয়ত’-এর অধিক নিকটবর্তী। তাত্তি¡কভাবে এই ধারাটিই অধিকতর শুদ্ধ। কিন্তু বিশে^র বাস্তবতায় এই উপধারাটির সাফল্যই তুলনামূলকভাবে কম। এখন সময় এসেছে এদের কর্মপন্থা-কর্মকৌশল পুনর্বিবেচনা করার। কর্মনীতিকে ঠিক রেখে কি করে আরো কার্যকরভাবে সফলতা অর্জন করা যায় সেটা কাজ করতে হবে।

বিশ^ায়ন
বিশ^ায়ন বর্তমান বাস্তবতা। বিশ^ায়নের প্রভাবে চিন্তা-ভাবনা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, পন্য সবকিছু অবাধে এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক জাতি থেকে অন্য জাতিতে হস্তান্তর হচ্ছে। মুসলমানদের ঈমান-আক্বিদা ও দ্বীনি জজবা দৃঢ় না থাকার কারণে মুসলমানেরা দ্রুত ও ব্যাপকহারে পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। মুসলমানরা বানের মতো পশ্চিমা সভ্যতার তোড়ে ভেসে যাচ্ছে। মুসলমানদের প্রত্যহ জীবনের সকল উপকরণ, সকল আবেগ-অনুভূতি, পশ্চিমা ধারণা ও উপকরণ দ্বারা পরিপূর্ণ। এমতাবস্থায় ইসলামী আন্দোলন; যা কিনা সরাসরি পশ্চিমা সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করবে, বড় রকমের বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে মুসলিম জনতাই ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। এটা সমকালের বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ।

পশ্চিম নির্মিত চিন্তা, কাঠামো ও নৈতিকতাবোধ
সুশাসন কাকে বলে? উন্নয়ন কাকে বলে? সরকারের দায়িত্ব কি? ইত্যাদি সকল প্রশ্নের জবাব নির্ধারিত হয় পশ্চিমের চিন্তা ধারার ওপর। মানুষের মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতাও নির্ধারিত হচ্ছে পশ্চিমের চিন্তা কাঠামোর ওপর। পশ্চিম যাকে ভালো বলছে সেটাকেই আমরা বাদ বিচারহীন ভালো বলে ধরে নিচ্ছি। পশ্চিম যাকে খারাপ বলছে সেটাকেই মুসলিম জাতি খারাপ বলে ধরে নিচ্ছে। কে জঙ্গি আর কে মুক্তিকামী তাও ওরা নির্ধারণ করে দিচ্ছে।
এক কথায় আমরা কি চিন্তা করবো, কিভাবে চিন্তা করবো, কোন বিষয়ে চিন্তা করবো, কোন মাপকাঠিতে চিন্তা করবো ইত্যাদি সবকিছু পশ্চিম ঠিক করে দিচ্ছে। এমনকি ইসলামের বয়ান কি হবে, ইসলামে রাজনীতি আছে কি নাই ও ইসলাম মডারেট হবে কিভাবে সব পশ্চিমারা ঠিক করে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় ইসলামী রাজনীতি করা আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জ।

মুসলিম বিশে^র বর্তমান অবস্থা হলো, হয় সেখানে যুদ্ধ চলছে অথবা সেখানে ¯ৈ^রাচারী কাউকে ক্ষমতায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো এই ¯ৈ^রাচারীরা আবার ‘উন্নয়ন’ এর শ্লোগাণ দিয়ে দেশের ওপরে নিজেদের অন্যায়কে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছে এবং ভোগবাদী, আরামপ্রিয় জনতা বাহ্যিক উন্নয়নের জন্য ¯ৈ^রাচারদেরকে সমর্থনও করছে। বাংলাদেশ এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এটা একটা চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার নিশ্চয়তা দেয়া এবং উন্নয়নের অসাড়তা দেখিয়ে মানুষের মাঝ থেকে কথিত উন্নয়নের মোহ ভঙ্গ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ইসলামী দল সমূহের পরিবর্তন বিমুখ চরিত্রও ইসলামী বিপ্লবের জন্য বড় বাঁধা। নিত্য পরিবর্তনশীল সমাজ-রাষ্ট্র ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন থাকা, সেই পরিবর্তনকে ইসলামের আলোকে ব্যাখ্যা করে করণীয়গুলো নিজেদের মধ্যে ধারণ করার মতো দল খুবই কম।
সারা বিশে^র মিডিয়া ইসলামের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। হয় তারা ইসলামকে হিং¯্র আকারে উপস্থাপন করবে অথবা ইসলামকে এড়িয়ে যাবে। দেশের বুদ্ধিজীবি সমাজও হয় এড়িয়ে যাবে অথবা ইসলাম সম্পর্কে ভুলভাবে উপস্থাপন করবে।

সবশেষে বলতে চাই, বর্তমান বিশ^ আর আগের বিশ^ নাই। গত দশ বছর আগের বিশ^ আর বর্তমান বিশ^ একরকম নেই। সব কিছু পরিবর্তন হয়েছে। ইসলামী দলগুলোকেও বর্তমান পরিবর্তনকে আমলে নিয়ে নিজেদেরকে সমকালীন করতে হবে।

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন