আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- সকাল ৮:০৭

আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সুদ

অর্থনীতির বিষফোড়া হিসেবে পরিচিত সুদি ব্যবস্থা ধনীকে আরো ধনী আর গরীবকে আরো গরীব বানাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ জঘন্য একটি হারাম কাজ।

আয়াত :
يايها الذين آمنوا لا تأكلوا الربا اضعافا مضاعفة واتقوا الله لعلكم تفلحون [ال عمران]
আয়াতের সরল অনুবাদ :
হে ঈমানদারগন!তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ বক্ষন করো না,আল্লাহ্ কে ভয় কর ,সম্ভবত তোমরা সফলকাম হবে। (www.iscabd.org)

আয়াতের তথ্য সমূহ :
সুরা আলে ইমরান। সূরা নং ০৩, আয়াত নং১৩০। পারা নং ০৪। সূরাটি মাদানী তথা হিজরতের পরে অবতীর্ণ হয়েছে।

অবতীর্ণের সময়কাল :
সূরা আল ইমরানের ১৩ রুকু থেকে শেষ পর্যন্ত ওহুদ যুদ্ধের পরে অবতীর্ণ হয়েছে। আর উল্লিখিত ১৩০ নং আয়াতটি ১৪ নং রুকুর অংশ বিশেষ।

সুরার নামকরণ :
সুরা আলে ইমরান এর নামকরণ হয়েছে (تسمية كل بإسم الجز) অনুসারে। অর্থাৎ সূরার ৩৩নং আয়াতে উল্লিখিত ال عمران (ইমরান আ. এর পরিবার সম্পর্কিত ) অংশটির নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছ। (www.iscalibrary.com)

আয়াতের শানে নুযুল :
হযরত আতা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন জাহেলী যুগে ছাকিফ গোত্রের লোকেরা বনু নাজিরের সাথে ব্যাপকহারে সুদি লেনদেন করত। যখন সুদ পরিশোধের সময় হতো তখন গরীব লোকেরা সুদ পরিশোধ করতে না পেরে সময় বাড়িয়ে নিত। তখন বনু নাজিরের লোকেরা সুদও বাড়িয়ে দিত। এমনিভাবে কয়েকবার সময় বৃদ্ধির ফলে দেখা যেত যে বনু নাজিরের লোকেরা বনু ছাকিফের গরীব লোকদের স্থাবর অস্থাবর সমস্ত সম্পদের মালিক হয়ে যেত। এমনিভাবে গরীবদের কাছ থেকে চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ গ্রহণ করত। তাদের এহেন জুলুম অত্যাচার নিষিদ্ধ করে সকল প্রকারের সুদি লেনদেন হারাম ঘোষণা করে আল্লাহ্ তায়ালা উক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন।

আয়াতের মূল বক্তব্য :
যেহেতু সুদের মাধ্যমে গরীব লোকেরা আরো গরীব হয়, ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং অন্য দিকে বিত্তবান ও ধনী লোকেরা আরো ধনী হতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে সমাজের বিত্তবানেরা গরীবদের উপর জুলুম নির্যাতন চালাত। যার ফলে আল্লাহ্ তায়ালা সুরা বাকারার ৪ টি আয়াতে এবং সুরা আলে ইমরানের ৩ টি আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা সুদের অবৈধতা ও তার বিধি বিধান সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যেমন সুরা বাকারার ২৭৫ নং আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
احل الله البيع وحرم الربا
অর্থাৎ আল্লাহ্ তায়ালা ক্রয় বিক্রয় কে হালাল এবং সুদ কে হারাম করেছেন। (Islami Shasantantra Chhatra Andolan)

এছাড়াও সুদ সম্পর্কিত অন্যান্য আয়াত সমূহের মাঝে সুদখোরের দুনিয়া ও আখেরাতে লাঞ্চনাদায়ক শাস্তির স্বরুপ ফুটে উঠেছে।

সুদের পরিচয় :
সুদ শব্দটি বাংলা। এর আরবি প্রতিশব্দ হলো الربا এর আভিধানিক অর্থ হলো : الزيادة বা বৃদ্ধি পাওয়া, الإضافة বা বাড়তি দেয়া-নেয়া।
পরিভাষায় : রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন كل قرض جر نفعا فهو ربا অর্থাৎ যে ঋণ কোনো মুনাফা টেনে আনে তাই সুদ।
আল্লামা ইবনুল আসির রহমাতুল্লাহি আলাইহি’র মতে-পারস্পরিক চুক্তির বাইরে সময়ের ওপর মূল মালের অতিরিক্ত অংশকে ربا বলা হয় ।
মোট কথা, একজাতীয় ২টি জিনিস লেনদেন করতে গিয়ে একটিতে বেশি হওয়াকে রিবা বা সুদ বলে। (www.twitter.com/iscabd91)

সুদের প্রকারভেদ :
ক. الربا তথা সুদ দুই প্রকার। যথা-
১) ربا النسيئة তথা বিলম্বে পরিশোধের শর্তে বিনা বিনিময়ে বেশি গ্রহণ বা প্রদান। একে الربا الجلي ও বলা হয়। জাহেলী যুগে এর প্রচলন বেশি ছিল। কেউ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্যে ঋণ দিয়ে মূলধনের অতিরিক্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করতো। আর সময় মত তা পরিশোধ করতে না পারলে সুদ বাড়িয়ে দেওয়ার শর্তে মেয়াদ বাড়িয়ে দিত। (ابن جرير) সর্বসম্মতি মতে, এই প্রকার সুদ হারাম।
২) الربا الفضل তথা দুটি বস্তু নগদে লেনদেন করার সময় কম বেশি করা। যেমন : ১ মণ গম দিয়ে ২ মণ গম ক্রয় বিক্রয় করা। এ প্রকার সুদও চার ইমামের ঐক্যমতে হারাম।

তবে, এক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ করে ক্রয় বিক্রয় করলে তা সুদ হবে না। যেমন : ১ মণ উন্নত মানের গমের মূল্য ১০০০ টাকা অপর দিকে ২ মণ নিম্ন মানের গমের মূল্য ১০০০ টাকা। এভাবে মূল্যনির্ধারণ করে বিনিময় করলে সুদ হবে না। (www.iscabd.org)

সুদের গুনাহ :
সুদের গুনাহ এতই মারাত্মক যে,এটা সবচেয়ে বড় সাতটি গুনাহের ১ টি। এর গুনাহ সম্পর্কে হাদিস শরীফে বলা হয়েছে-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: درهم ربا أ شد على الله ست و ثلاثين زنية(رواه البيهقي)
অর্থাৎ সুদের ১ দিরহাম আল্লাহ্ তায়ালার নিকট ৩৬ টি যিনা অপেক্ষা বেশি মারাত্মক।

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:إن الربا سبعون بابا أدناها أن يقع الرجل على أمه (رواه إبن
ماجه )
অর্থাৎ নিশ্চয়ই সুদের ৭০ টি গুনাহ রয়েছে ।সবচেয়ে ছোট গুনাহ হলো ব্যক্তি তার স্বীয় মায়ের সাথে ব্যভিচার করা।

لعن رسول الله صلى الله عليه وسلم فى الربا خمسة آكل الربا ومؤكله وشاهديه و كاتبه
অর্থাৎ রাসূল ﷺ সুদের ব্যাপারে ৫ জন ব্যক্তিকে লানত বা অভিশাপ দিয়েছেন। যথা :১. সুদ গ্রহীতা ২. সুদ দাতা ৩ ও ৪. স্বাক্ষীদ্বয় এবং ৫. লেখক।

সুদের ক্ষতি বা কুফলসমূহ :
ইসলামী শরিয়ত সুদকে ধর্মীয় ও সামাজিক সর্বনাশা ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।সুদের মারাত্মক কিছু কুফল নিচে প্রদত্ত হলো
১)ব্যক্তিগত কুফল
২)সামাজিক কুফল
৩)অর্থনৈতিক কুফল

ব্যক্তিগত কুফল :
সুদ খাওয়ার কারণে মন নষ্ট হয়ে যায়। অন্তরের শান্তি চলে যায়। ভাই-ভাইয়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক বিলীন হয়ে যায়। সুদখোর হিংস্র প্রাণীতে পরিণত হয়। সম্পদ সঞ্চয় করা, মানুষের রক্ত চুষে খাওয়া ও অপরের সম্পদ লুণ্ঠন করাই তার জীবনের মূল লক্ষ্য হয়ে যায়।

সামাজিক কুফল :
সুদ সমাজের মানুষের মাঝে ঘৃণা সৃষ্টি করে।
সুদ সমাজস্থ মানুষের মাঝে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে।
সুদ মানুষ কে কৃপণ করে।
সুদ সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। (Islami Shasantantra Chhatra Andolan)

অর্থনৈতিক কুফল :
সুদ শোষণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
এটি ধনীকে আরো ধনী আর গরীবকে আরো গরীব বানায়।
সুদখোরকে অলস ও উপার্জন বিমুখ গড়ে তুলে।
সুদি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হলে তার ক্ষতি জাতির কাঁধে এসে পড়ে ।
অর্থনীতির চালিকাশক্তি গুটি কয়েক লোকের হাতে চলে যায়।

আয়াতের শিক্ষা :
উল্লিখিত আয়াত থেকে আমরা যে সকল শিক্ষা পেয়ে থাকি তা হলো-
আল্লাহ্ তায়ালা সুদকে হারাম এবং ব্যবসাকে হালাল করেছেন।
সুদের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের মাঝে বরকত থাকে না।
সুদখোর জাহান্নামে যাবে।
সুদ অন্যের সম্পদ শোষণকারীদের বড় হাতিয়ার।

লেখক : মুহা. মিজানুর রহমান আতিকী, মুবাল্লিগ, নোয়াখালী জেলা উত্তর

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন