আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

এখন সময়- সকাল ৮:০৭

আজ ২৭শে জুন, ২০২১ ইং রবিবার | ১৬ই জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরী | ১৩ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সুন্নাহ ও বিদ’আহ

হাদীসের অনুবাদ :
হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া রা. হতে বর্নিত, তিনি বলেন একদিন ফজরের নামাজের পর রাসূল সা. আমাদেরকে এমন এক উচ্ছাঙ্গের উপদেশ দিলেন যে, আমাদের চোখ থেকে পানি পরতে লাগলো এবং হৃদয় শংকিত হয়ে পড়লো। তখন এক ব্যক্তি বললেন এতো বিদায়ী ব্যক্তির মত উপদেশ। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের জন্য কি অসিয়ত করে যাচ্ছেন? রাসূল সা. বলেন, তোমাদের আমি আল্লাহ তাআলা কে ভয় করার অসিয়ত করছি। যদি হাবশী গোলাম ও আমীর নিযুক্ত হয় তবুও তার প্রতি অনুগত থাকবে তার নির্দেশ শুনবে। তোমাদের মাঝে যারা বেচে থাকবে তারা বহু বিরোধ মুকাবিলা করবে। তোমরা সাবধান থাকবে নতুন নতুন বিষয় লিপ্ত হওয়া থেকে, কারন তা হলো গুমরাহী। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি ঐ যুগ পাবে তার কর্তব্য হলো আমার সুন্নত ও হেদায়েত প্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতের উপর সুদৃঢ় থাকা। এগুলো তোমরা চোয়ালের ধাত দিয়ে ধরে রাখবে। (www.iscabd.org)
(তিরমিজি হাদীস নং ২৬৭৬ অধ্যায় ইলম)

হাদীসের পরিচয় :
হাদীসের মান সহীহ উক্ত হাদীসে সাহাবা রা. “এতো বিদায়ী ব্যক্তির মত উপদেশ” এই বাক্যটি বলার কারন-
১. রাসূল সা. এর সেই দিনের ভাষন ছিলো কাউকে বিদায়দানকারীর উপদেশের মত অর্থাৎ কোন বিদায়দানকারী যখন কাউকে বিদায় জানায় তখন সে তাকে অতি প্রয়োজনীয় সব বিষয়েই নেহাৎ নিষ্ঠার সাথে স্বশব্দে বিরাট নসীহত করে দেয় ঠিক তেমনই ছিলো রাসূলের সেদিনকার নসীহত। এজন্যই সাহাবি রাসূলের সেদিনকার ভাষন কে বিদায় দান কারীর ভাষন এর সাথে তুলনা করেছেন।
২. এখানে মুল নসীহত কে বিদায় দান কারীর নসীহত এর সাথে তুলনা দেওয়া উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেদিের নসীহত ছিলো প্রতিক্রিশীল এর মত বুঝানো।
৩. রাসূলের সেদিনের নসীহত শুনে মনে হচ্ছিলো তিনি শীগ্রই আমাদের থেকে বিদায় নিবেন। (www.iscalibrary.com)

নসীহত সমূহ :
(ক) রাসূল সা. যে নসীহত সমুহ করেছেন তার প্রথম টি হলো “আলাইকুম বিতাকওয়াল্লাহ” এর ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী কারী রহ. বলেন, এই ছোট্ট একটি বাক্যে দ্বীনের সারাংশ অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। কেননা তাকওয়া হলো সমস্ত করনীয় বিষয় সমূহ করা ও বর্জনীয় বিষয় সমূহ বর্জন করার নাম। যেমন ইবনে আব্বাস রা. বলেন, “রা’ছুন দ্বীন আত্তাকওয়া” দ্বীনের মুলই হলো তাকওয়া।

তাকওয়ার পরিচয় : একবার হযরত ওমর ফারুক রা. হযরত উবাই রা. কে তাকওয়ার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আপনি যখন কন্টকাকির্ন জঙ্গল দিয়ে অতিক্রম করেন তখন কিভাবে অতিক্রম করেন? ওমর রা. বললেন, আমি এমনভাবে চলি যাতে একটি কাটার আচড়ও না লাগে। উবাই ইবনে কা”ব রা. বললেন তাকওয়া হলো এমনভাবে চলা যাতে বদদ্বীনের একটি আচড় ও না লাগে। (www.facebook.com/iscabd91
তাকওয়ার স্তর : ১. শেরক থেকে বেচে থাকা।
২. কবীরা গুনাসমুহ থেকে বেচে থাকা।
৩. ছোট খাট গুনাহসমুহ থেকে বেচে থাকা।

(খ) রাসূল সা. এর দ্বিতীয় যে নসীহত করেছেন তা হলো যদি হাবশী গোলাম ও তোমাদের আমীর নিযুক্ত হয় তবুও তার প্রতি অনুগত থাকবে। এই হাদীস দ্বারা হাবশী গোলাম এর এতায়াত করার জন্য বলা হচ্ছে কিন্তু অন্য হাদীসে বলেন, “আল আইম্মাতু মিন কুরাইশ” নেতা সর্বদা কুরাইশ থেকেই হবে। উভয় হাদিসের মাঝে মতবিরোধ দেখা দেয় তাই
“আল আইম্মাতু মিন কুরাইশ” এর ব্যাখ্যা হলো
১. হাদিসে আমীরের হুকুম মান্য করার প্রতি বিশেষ তাগিদ দেয়ার লক্ষেই এ কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ যদি ধরে নেওয়া হয় কোন হাবশী কৃতদাস কেও তোমাদের আমীর নিযুক্ত করে দেওয়া হলো যে কিনা আমীরের যোগ্যতা রাখেনা তার আনুগত্য করাও তোমাদের জন্য জরুরী।
২. সাধারণভাবে কোন কৃতদাস আমীর হতে পারে না তবে যদি জোরপুর্বক সে তোমাদের আমীর হয়েই যায় তবে তার আনুগত্য করাও তোমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য তা না হলে ফেৎনা সৃষ্টি হবে।
৩. হাদিসে হাবশী গোলাম বলে প্রকৃত অর্থে হাবশী কৃতদাস নয় রুপক অর্থে “আবদ” বলতে এমন ব্যাক্তি উদ্দেশ্যে যার বুদ্ধি ও যোগ্যতা একে বারেই সামান্য আর “হাবশী” বলতে কুৎসিত ও কমাকৃতির ব্যক্তি উদ্দেশ্য সুতরাং মর্ম হবে তোমাদের উপর যদি এমন কাউকে আমীর বানিয়ে দেওয়া হয় যার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন কোন যোগ্যতা নেই অর্থাৎ সে যেমনিভাবে কুৎসিত তেমনিভাবে স্বল্পবুদ্ধি সম্পন্ন তবুও তার আনুগত্য করে যেতে হবে তাকে বরখাস্ত করার জন্য আন্দোলন করা যাবেনা। (www.twitter.com/iscabd91)

(গ) তৃতীয় নসীহত টি ছিলো, আমার পর অনেক মতপার্থক্য দেখা দিবে তোমরা যারা জীবিত থাকবে তারা এই সব মতপার্থক্যের মোকাবেলা করবে তখন খুবই সাবধান থাকবে নতুন নতুন বিষয়ে লিপ্ত হওয়া থেকে।
“আমার পর অনেক মতপার্থক্য দেখা দিবে” এর ব্যাক্ষায় মুফতী তাকী উসমানী সাহেব দা: বা: লিখেন যে, রাসূল সা. এর ওফাতের পর বিভিন্ন বাতিল ফেরকা সমুহের আবির্ভাব ও তাদের পক্ষ থেকে আকীদাগত নানা মত ও পথ সৃষ্টি হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

(ঘ) রাসূল সা. এর চতুর্থ নসীহত টি ছিলো তোমাদের মাঝ কেউ যদি ঐ যুগ পায় তাঁর কর্তব্য হলো আমার সুন্নত ও খোলাফায়ে রাশেদীনের উপর সুদৃঢ় থাকা।
“সুন্নাতুল খুলাফাইর রাশিদীন” এর ব্যাখ্যায় মুফতী তাকী উসমানী সাহেব লিখেন ইহার দুটি অর্থ হতে পারে।
১. আভিধানিক ও ব্যাপক অর্থ যার মাঝে এমন সব উলামায়ে উম্মত অন্তর্ভুক্ত, যারা রাসূল সা. এর মুবারক সীরাত নিজের জীবনের জন্য আদর্শ হিসেবে অবলম্বন করেছেন। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী “খুলাফায়ে রাশিদীন” এর মাঝে প্রসিদ্ধ চার খলিফা ছাড়াও চার ইমাম, ফুকাহা, মুহাদ্দেসীন ও মুজতাহিদীন উলামা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এই মতের সমর্থনে রাসূল সা. এর হাদীস “লা নাবিয়্যা বা’দি ওয়া ছায়াকুনু খুলাফাআ কাছিরুন” আমার পর আর কোন নবী আসবেনা। তবে অনেক খলীফা হবে।
২. খুলাফায়ে রাশেদীন” এর আরেকটি অর্থ হলো পারিভাষিক ও বিশেষ অর্থ যাতে প্রসিদ্ধ খুলাফায়ে রাশেদীনই কেবল অন্তর্ভুক্ত হবে। (www.iscalibrary.com)

হাদিসের শিক্ষা :
১. খিলাফত এর দায়িত্ব আমরা যেহেতু নিজেদের উপর আবশ্যক করে নিয়েছি, তাই আমাদের কে ছোট থেকে ছোট গুনাহ থেকেও বেঁচে থাকতে হবে।
২. আমীর এর আনুগত্য যদি শরীয়ত বিরোধী না হয় তাহলে নির্দ্বিধায় মেনে নিতে হবে।
৩. কারো সাথে তর্ক বিতর্ক করার ক্ষেত্রে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যে বিষয় আমার কাছে দলীল নেই বা দলীল থাকলেও এই বিষয় নিয়ে তর্ক করতে গেলে ফেৎনা সৃষ্টি হয় তা থেকে বেচে থাকতে হবে।
৪. সর্ব অবস্থায় রাসূল সা. এর সুন্নত ও হেদায়েত প্রাপ্ত খোলাফাদের তথা উলিল আমারের পদঙ্ক অনুসরণ করতে হবে।

Leave a Comment

লগইন অথবা নিবন্ধন করুন

লগইন
নিবন্ধন